সবুজে সাজুক গাইবান্ধা: বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বৃক্ষরোপণ ও জনসচেতনতার ডাক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

প্রকৃতি ও পরিবেশ বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানুষ এই চিরন্তন সত্যকে সামনে রেখে গাইবান্ধায় অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হলো বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ‘জলবায়ু পরিবর্তন আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা’ এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে জেলা প্রশাসন ও জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে দিনভর নানা কর্মসূচির আয়োজন করে। বৃহস্পতিবার সকালে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দিবসের শুভ সূচনা হয়। এই অনুষ্ঠানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, “আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেনের কোনো বিকল্প নেই, আর সেই অক্সিজেন আসে গাছ থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ দিন দিন কমছে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, একটি দেশের সুস্থ পরিবেশের জন্য অন্তত ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন, অথচ আমাদের দেশে সেই লক্ষ্যমাত্রা এখনও পূরণ হয়নি। জেলা প্রশাসক ঘোষণা করেন যে, চলতি বছর গাইবান্ধার প্রতিটি গ্রাম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত ২০% বেশি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ বাড়ির আঙিনায় কমপক্ষে দুটি করে ফলজ ও বনজ গাছ লাগানোর আহ্বান জানান।

আলোচনা সভায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তারা জানান, বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশ তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। গাইবান্ধার মতো নদী বিধৌত জেলাগুলোতে নদী ভাঙন ও বন্যার প্রকোপ বাড়ছে প্রায় ১৫% হারে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আজহারুল ইসলাম বলেন, “পরিবেশ রক্ষায় সরকার প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে। কেবল সরকারি বাজেটে সব হবে না, আমাদের নিজেদের মানসিকতা বদলাতে হবে।” তিনি বিশেষ করে পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার ১০০% বর্জন করার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ জানান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরিফ আল রাজিব। তিনি পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, “যারা অবৈধভাবে পুকুর ভরাট করছে কিংবা নদী দখল করে পরিবেশ নষ্ট করছে, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।” এছাড়াও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক যাদব সরকার জানান, পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জেলার প্রতিটি উপজেলায় তারা মনিটরিং সেল গঠন করেছেন। বক্তারা জলাশয় দূষণমুক্ত রাখা এবং কলকারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে না ফেলার জন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন। তারা বলেন, গাইবান্ধার উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশবান্ধব।

সভায় পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ অবদান রাখার জন্য স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। তাদের এই সম্মাননা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো অন্যদের পরিবেশ রক্ষায় উৎসাহিত করা। পুরস্কারপ্রাপ্তরা তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, এই স্বীকৃতি তাদের আগামীতে আরও বেশি গাছ লাগাতে এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক শের আলম জানান, তারা নিয়মিতভাবে জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে বায়ু ও পানি পরীক্ষা করছেন যাতে দূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অনুষ্ঠানে সাংবাদিক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে তাদের মতামত তুলে ধরেন।

আলোচনা সভা শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এসময় সবার হাতে ছিল পরিবেশ রক্ষার স্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন। র‍্যালি চলাকালীন সাধারণ মানুষের মাঝে পরিবেশ সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়। র‍্যালিটি পুনরায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে ফিরে এলে সেখানে কয়েকশ’ শিক্ষার্থীর মাঝে বিনামূল্যে বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়। শিক্ষার্থীরা পরম আগ্রহে এই চারাগুলো গ্রহণ করে এবং নিজ হাতে রোপণ করার অঙ্গীকার করে। একজন শিক্ষার্থী বলেন, “আমি আমার স্কুলে অন্তত ৫টি গাছ লাগাব এবং সেগুলোর যত্ন নেব।”

গাইবান্ধার এই আয়োজনটি কেবল একদিনের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে সারাবছর ধরে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক। তিনি জানান, সরকার পরিবেশ উন্নয়নের জন্য জেলা পর্যায়ে প্রায় ৫ লক্ষ ডলার ($) সমপরিমাণের একটি বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করছে, যা দিয়ে নদী শাসন ও বনায়ন কার্যক্রম চালানো হবে। পরিবেশ দিবসের এই কর্মসূচি প্রমাণ করে যে, গাইবান্ধার মানুষ তাদের প্রকৃতি নিয়ে কতটা সচেতন। সবাই যদি আজ থেকে অন্তত ১০% অপচনশীল বর্জ্য ব্যবহার কমিয়ে দেয়, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়া সম্ভব হবে।

বিকেলে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ পলিথিন বিরোধী অভিযান চালানো হয়। এতে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করার পাশাপাশি পরিবেশ আইনের কঠোর প্রয়োগের বার্তা দেওয়া হয়। গাইবান্ধার সাধারণ মানুষ এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। দিনশেষে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসের সমাপ্তি ঘটে, যেখানে গানে ও নাটকের মাধ্যমে পরিবেশের গুরুত্ব ফুটিয়ে তোলা হয়। এই দিনটি গাইবান্ধাবাসীর জন্য কেবল একটি দিবস ছিল না, বরং এটি ছিল সুন্দর ও সবুজ এক ভবিষ্যৎ গড়ার শপথ নেওয়ার দিন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ