নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠের এক প্রান্তে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন নেইমার। চোখের জলে তার যেন সব স্বপ্ন ভেসে যাচ্ছিল। দলের এই সবচেয়ে বড় তারকাকে সান্ত্বনা দিতে দৌড়ে এসেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। কিন্তু ভিনিসিয়ুসকে সান্ত্বনা দেবে কে? পুরো বিশ্বকাপে তিনি একাই ব্রাজিলের হয়ে লড়াই চালিয়ে গেছেন। কিন্তু আজ আর কোনো কিছুতেই কিছু হলো না। আজ সবাইকে একাই ছায়ায় ঢেকে দিলেন নরওয়ের অবিশ্বাস্য স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড। তার দুর্দান্ত জোড়া গোলেই নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হলো ব্রাজিলকে। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে এত তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে হলো পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের, যা ব্রাজিল ভক্তদের জন্য এক বিরাট ধাক্কা।
অন্যদিকে, ফুটবল বিশ্বের পরাশক্তি ব্রাজিলকে হারিয়ে নরওয়ে গড়েছে এক নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই তাদের সেরা সাফল্য। সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে বা কোয়ার্টার ফাইনালে এবার তাদের প্রতিপক্ষ হবে মেক্সিকো কিংবা ইংল্যান্ড। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিল বেশ মন্থর গতির ফুটবল খেলেছে। তারা শুরু থেকে প্রেসিংয়ে না গিয়ে নরওয়েকে বলের দখল রাখতে দিয়েছে এবং সুযোগ বুঝে পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তেমনই এক পাল্টা আক্রমণ থেকে ম্যাচের শুরুতেই বক্সের ভেতর মাতেউস কুনিয়া ফাউলের শিকার হলে ব্রাজিল একটি পরিষ্কার পেনাল্টি পায়। কিন্তু সেই সুবর্ণ সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেননি ব্রুনো গিমারাইস। তার নেওয়া পেনাল্টি শটটি নরওয়ের গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দেন।
শুরুতে খুব একটা সুযোগ তৈরি করতে না পারলেও, নরওয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নেয় এবং আক্রমণে গিয়ে ব্রাজিলকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করে। ব্রাজিল পেনাল্টি মিসের পর প্রথমার্ধে দুই-একবার গোলের কাছাকাছি গেলেও শেষ পর্যন্ত গোলের দেখা পায়নি। বিরতির পরও দুই দলের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে ম্যাচটি দারুণ জমে উঠেছিল। এর মধ্যে মাতেউস কুনিয়াকে তুলে নিয়ে বদলি হিসেবে তরুণ স্ট্রাইকার এনদ্রিককে মাঠে নামান ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি। মাঠে নেমেই ম্যাচের সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পেয়েছিলেন এনদ্রিক। ভিনিসিয়ুসের অসাধারণ এক পাসে বক্সের ভেতর বল পান তিনি। তার সামনে ছিল শুধুই গোলরক্ষক। কিন্তু এমন নিশ্চিত গোলের সুযোগ তিনি পোস্টের বাইরে বল মেরে নষ্ট করেন। এই মিসটিই হয়তো ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
এরপর ম্যাচের ৬৮ মিনিটে দর্শকদের গর্জনের মধ্যে মাঠে আসেন নেইমারও। তবে নেইমার মাঠে থিতু হওয়ার আগেই চমক নিয়ে হাজির হন নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে হলান্ডের এক দুর্দান্ত হেডে করা গোলেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় নরওয়ে। এই গোল খাওয়ার পর ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টায় থাকা ব্রাজিলকে হলান্ড দ্বিতীয় ধাক্কা দেন ঠিক ৯০ মিনিটে। বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া তার অসাধারণ এক শটে গোল করে লিড ২-০ করেন তিনি। এই গোলের মাধ্যমে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে ৭ গোল নিয়ে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির ঠিক পাশে উঠে এসেছেন নরওয়ের এই স্ট্রাইকার। মূলত এই দ্বিতীয় গোলের পরই ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ে ব্রাজিল। শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে নেইমার এক গোল শোধ করলেও, সেটি ছিল শুধুই সান্ত্বনা।
ম্যাচের আগে সবার নজর ছিল আর্লিং হলান্ড ও ব্রাজিলের ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েলের দ্বৈরথের দিকে। আর্সেনালে খেলা গ্যাব্রিয়েল ও ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলা হলান্ডের লড়াই প্রিমিয়ার লিগের দর্শকদের কাছে খুব পরিচিত একটি দৃশ্য। জাতীয় দলের জার্সিতে তাদের নতুন এই মুখোমুখি লড়াই নিয়েও তাই দর্শকদের বাড়তি আগ্রহ ছিল। তবে ম্যাচের শুরুতে সেই লড়াই খুব একটা জমে ওঠেনি। বিরতির পর গ্যাব্রিয়েলকে পুরোপুরি কুপোকাত করেই গোল দুটি আদায় করে নেন হলান্ড।
এই হতাশাজনক হারের পর ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, পুরো ম্যাচে ব্রাজিল বলের দখলে ছিল মাত্র ৩৩.৫% সময়। দলটি মূলত পাল্টা আক্রমণের ওপর নির্ভর করলেও তৈরি হওয়া সুযোগগুলো তারা ১০০% কাজে লাগাতে পারেনি। ব্রাজিল পুরো ম্যাচে ১৪টি শট নিয়েছে, যার মধ্যে লক্ষ্যে ছিল মাত্র ৪টি। তাদের প্রত্যাশিত গোল বা এক্সজি (xG) ছিল ২.৭৩। অথচ নরওয়ের এক্সজি ছিল মাত্র ০.৮৪। অর্থাৎ, তুলনামূলক কম সুযোগ তৈরি করেও সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করে বাজিমাত করেছে নরওয়ে।
ইতালিয়ান কোচ আনচেলত্তি গত ২০২৫ সালের মে মাসে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে অনেক আশা নিয়ে ব্রাজিলের দায়িত্ব নেন। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে তার চুক্তির মেয়াদ ২০৩০ আসর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি এই হতাশাজনক বিদায়ের পর আনচেলত্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়তো প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই শুরু হয়ে যাবে।
















