নারী অ্যাথলেট জান্নাত ও কবিতার পদক বাতিল: পুরুষ প্রমাণিত হওয়ায় আজীবন নিষেধাজ্ঞা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটল। এতদিন নারী হিসেবে জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া জান্নাত বেগম ও কবিতা রায়কে আসলে পুরুষ হিসেবে শনাক্ত করেছে অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন। আজ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের নতুন অ্যাডহক কমিটির সভায় এই দুই অ্যাথলেটকে আজীবন নিষিদ্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সাথে তারা নারী হিসেবে এ পর্যন্ত যতগুলো পদক জিতেছেন, তার সবকটি বাতিল করা হয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে পুরো দেশের ক্রীড়া মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

১৯ বছর বয়সী কবিতা রায় ছিলেন একজন উঠতি স্প্রিন্টার এবং ২৮ বছর বয়সী জান্নাত বেগম ছিলেন থ্রোয়ার। জান্নাত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এবং কবিতা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে অ্যাথলেট হিসেবে নিয়মিত অংশ নিতেন। অনেক দিন ধরেই তাদের লিঙ্গ নিয়ে সহকর্মী ও অন্য নারী অ্যাথলেটদের মধ্যে নানা গুঞ্জন ছিল। অভিযোগ উঠেছিল যে, তারা আদতে শারীরিক গঠনে পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও নিয়ম ভেঙে নারী বিভাগে খেলছেন। এই গুরুতর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অ্যাথলেটিক ফেডারেশনের আগের কমিটি একটি উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ তদন্ত করতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশেষজ্ঞ বোর্ড গঠন করে। ৫ সদস্যের এই অভিজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর থেকে তাদের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করে। দীর্ঘ প্রায় ৮ মাস ধরে চলে তাদের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অবশেষে গত ১১ মে তাদের কার্যক্রম শেষ হয় এবং ১৬ মে চূড়ান্ত মেডিকেল রিপোর্ট ফেডারেশনের হাতে জমা পড়ে। সেই রিপোর্টে যে ফলাফল এসেছে তা দেখে অবাক হয়েছেন খোদ ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা।

মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই দুই অ্যাথলেটের শরীরে পুরুষের হরমোন বা টেস্টোস্টেরনের মাত্রা অকল্পনীয় রকম বেশি। জান্নাত বেগমের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পাওয়া গেছে ১৯ দশমিক ৬৬ এনমোল/লিটার। এটি ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকসের নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার (২ দশমিক ৫ এনমোল/লিটার) চেয়ে প্রায় ৮ গুণ বা ৮০০% বেশি। অন্যদিকে কবিতা রায়ের শরীরে এই হরমোনের মাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৫০ এনমোল/লিটার, যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রায় সাড়ে ৬ গুণেরও বেশি। ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকসের নিয়ম অনুযায়ী, নারী বিভাগে খেলতে হলে অ্যাথলেটের হরমোন মাত্রা টানা ২৪ মাস ২ দশমিক ৫-এর নিচে থাকতে হয়।

বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী ইমাম তপন এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট জানান, চিকিৎসক বোর্ডের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো ওরা দুজন নারী নয়, বরং পুরুষ। এই ভয়াবহ জালিয়াতির জন্য জান্নাত ও কবিতাকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তারা আর কখনো নারী হিসেবে কোনো প্রতিযোগিতায় নামতে পারবেন না। জান্নাতের সংগ্রহে ছিল ৯টি পদক, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি সোনার পদকও ছিল। কবিতার ছিল মোট ৪টি পদক। এখন এই ১৩টি পদকই বাতিল করা হয়েছে এবং সেগুলো পরবর্তী অবস্থানের অ্যাথলেটদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হবে।

এই ঘটনা বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের জন্য একটি বড় কলঙ্ক ও শিক্ষা হয়ে থাকবে। ফেডারেশন মনে করছে, ১০০% স্বচ্ছতা না থাকলে সত্যিকারের নারী খেলোয়াড়রা তাদের প্রাপ্য সম্মান ও পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হন। জান্নাত ও কবিতা এতদিন ধরে অবৈধভাবে পদকগুলো নিজেদের দখলে রেখেছিলেন, যা অন্য পরিশ্রমী নারী অ্যাথলেটদের প্রতি চরম অবিচার। সেনাবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর সদস্য হয়েও জান্নাতের এমন তথ্য গোপন করা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমানে অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের নতুন কমিটি দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে কলঙ্কমুক্ত করতে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে। তারা বলছে, ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে কোনো অ্যাথলেটকে দলে নেওয়ার আগে তাদের শারীরিক ও মেডিকেল পরীক্ষা আরও কড়াকড়িভাবে সম্পন্ন করা হবে। জান্নাত ও কবিতার এই আজীবন নিষেধাজ্ঞা দেশের অন্য খেলোয়াড়দের জন্য একটি কড়া সতর্কবার্তা। জালিয়াতি করে আর কেউ যেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে অপবিত্র করতে না পারে, সেজন্য ফেডারেশন এখন শতভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

এই ঘটনার পর অনেক ভুক্তভোগী নারী অ্যাথলেট হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন। তাদের দাবি, জান্নাত ও কবিতার অস্বাভাবিক পেশীশক্তি ও গতির কাছে তারা প্রতিযোগিতায় পেরে উঠতেন না। এখন প্রকৃত নারীরা তাদের পদকগুলো ফিরে পাওয়ায় এক ধরণের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের এই ঘটনাটি বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের দরবারে বাংলাদেশের জন্য একটি বিব্রতকর অধ্যায় হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ