রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার চান মিয়া হাউজিংয়ে এখন রান্নার চুলা জ্বলে না। দীর্ঘ ১ মাস অর্থাৎ প্রায় ৩০ দিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকটে নাভিশ্বাস উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। অথচ মাস শেষে গ্যাসের বিল ঠিকই গুনতে হচ্ছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো সমাধান তো মিলছেই না, উল্টো কবে নাগাদ গ্যাস আসবে সেটিও কেউ জানে না। বিকল্প হিসেবে অনেকে কয়েক হাজার টাকা খরচ করে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন, কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই। নতুন করে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ লোডশেডিং। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন এখন পুরোপুরি বিষিয়ে উঠেছে। সকালে নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের খাবার সব কিছুর জন্যই এখন হাহাকার চলছে ঘরে ঘরে।
কাজী তাহমিদা আফরোজ নামের একজন গৃহিণী আক্ষেপ করে বলেন, “প্রায় এক মাস হয়ে গেল আমাদের এলাকায় গ্যাস নেই। প্রথম কয়েক দিন ৩ থেকে ৪ দিন একটু মিটমিট করে গ্যাসের দেখা মিলত, কিন্তু এখন ১০০% গ্যাসহীন অবস্থায় আছি।” প্রতিদিনের রান্নার কাজ এখন এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা গ্যাস থাকলেও কোনোভাবে কাজ চালিয়ে নেওয়া যেত, কিন্তু এখন চুলা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। ফলে সন্তানদের জন্য সময়মতো খাবার তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। বাইরের কেনা খাবার খেয়ে পরিবারের সদস্যদের পেটের সমস্যাও দেখা দিচ্ছে বলে তিনি জানান।
এলাকার আরেক বাসিন্দা মোস্তফা নাজমুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা কি শুধু বিল দেওয়ার জন্যই কাজ করি?” তিনি দাবি করেন, গ্যাস না দিতে পারলে প্রিপেইড মিটার বা মাসিক লাইনের বিল অন্তত ৫০% কমিয়ে দেওয়া উচিত অথবা পুরোপুরি মওকুফ করা উচিত। তার মতে, ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় গ্যাস থাকলেও তাদের এলাকায় মাসের পর মাস এমন দুরবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। নিত্যপণ্যের দাম যেখানে ১০% থেকে ২০% হারে বাড়ছে, সেখানে গ্যাসের জন্য বাড়তি খরচ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের উচিত একটি নির্দিষ্ট সময়সূচী দেওয়া, যাতে মানুষ অন্তত মানসিক প্রস্তুতি নিতে পারে।
গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে রাসেল দাস নামের এক চাকরিজীবী আরও বড় বিপদে পড়েছেন। তিনি প্রায় ৪,০০০ টাকা খরচ করে একটি বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। রাসেল বলেন, “গতকাল অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে রান্না বসিয়েছি, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে গেল। টানা ১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।” ফলে তার রান্নার সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। লোডশেডিং এখন এই এলাকায় আগের চেয়ে অন্তত ৩০% বেড়েছে বলে বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন। ফলে বৈদ্যুতিক চুলা এখন ঘরে সাজিয়ে রাখার শো-পিস ছাড়া আর কিছুই নয়।
বৈদ্যুতিক চুলার রান্নায় খরচও অনেক বেশি। প্রতি ইউনিটে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় মাসে বিলের সাথে অতিরিক্ত আরও ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা যোগ হচ্ছে। মোস্তফা নাজমুল হাসান বলেন, “আমার আয় তো ১% ও বাড়েনি, কিন্তু খরচের বোঝা এখন দ্বিগুণ হয়ে গেছে।” রান্নার মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক সময় অর্ধেক রান্না করা খাবার নষ্ট হয়ে যায়। তার ওপর সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে গেলে ১,৫০০ টাকার ওপরে গুনতে হচ্ছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই বাড়তি খরচের বোঝা বহন করা এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মাসিক বাজেটের অন্তত ১৫% এখন বাড়তি জ্বালানি খরচে চলে যাচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দাদের দাবি যদি নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব না হয়, তবে তিতাস যেন একটি সুনির্দিষ্ট শিডিউল দেয়। রাসেল দাসের মতে, “আমরা যদি জানতাম দিনের কোন ২ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে, তবে সেই অনুযায়ী কাজ গুছিয়ে রাখতাম।” বর্তমানে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে সবার। সরকারের কাছে তাদের আকুল আবেদন, দয়া করে সাধারণ মানুষের এই মৌলিক সমস্যার সমাধান করুন। ডাল-ভাত খেয়ে শান্তিতে বেঁচে থাকাটাই এখন রাজধানীবাসীর জন্য এক প্রকার বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এখন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করার কথা ভাবছে।
তবে এই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট শুধু মোহাম্মদপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর কলাবাগান, কাফরুল, কাজীপাড়া, পশ্চিম তেজতুরী বাজার এবং বাড্ডার মতো জনবহুল এলাকাগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। এসব এলাকায় কোথাও গ্যাসের চাপ এতই কম যে দিয়াশলাই দিয়েও আগুন জ্বালানো যাচ্ছে না। কিছু এলাকায় গভীর রাতে ১টা বা ২টার সময় গ্যাস আসলেও তখন রান্না করা গৃহিণীদের জন্য অসম্ভব। সব মিলিয়ে গোটা ঢাকা শহর এখন এক বিশাল সংকটের কবলে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে জনরোষ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
















