ইরানকে একঘরে করতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’: তেহরানের ওপর কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে। সোমবার ওয়াশিংটনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই ঘোষণা দেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করাই এখন ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য। তেহরানের আয়ের প্রধান উৎস তেল ছাড়াও আয়ের অন্যান্য সব পথ বন্ধ করে দিতে চায় মার্কিন প্রশাসন। এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্বের কোনো দেশ বা কোম্পানি আর ইরানের সাথে সহজে ব্যবসা করার সাহস পাবে না। মার্কিন প্রশাসনের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন।

এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ বা অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার অভিযান। অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট একে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক সামরিক অভিযানের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই অভিযানের আওতায় ইরানের ৫টি প্রধান অর্থনৈতিক খাতকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই খাতগুলো হলো—ডিজিটাল সম্পদ, আধুনিক প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল এবং নৌপরিবহন। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের প্রতিটি অর্থনৈতিক লাইফলাইন বা বেঁচে থাকার পথ ১০০% বিচ্ছিন্ন করতে। যতক্ষণ না তেহরান বিশ্ব দরবারে পুরোপুরি একা হয়ে পড়ছে, ততক্ষণ এই কঠোর পদক্ষেপ ও চাপ প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রক্রিয়াকে সফল করতে নিজেই সরাসরি মাঠে নেমেছেন। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের নেতাদের ফোন করে ইরানের সাথে সব ধরণের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে অনুরোধ জানাচ্ছেন। বেসেন্ট জানিয়েছেন, ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বিশ্বনেতাদের সাথে কথা বলছেন। এখন বিশ্বের দেশগুলোকে একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে হয় তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখবে, না হয় ইরানের সাথে। কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান যদি দুই পক্ষকেই খুশি রাখতে চায়, তবে তাদের ওপর ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা’ দেওয়া হবে। এর ফলে ওই দেশের ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোও মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যাবে।

ওয়াশিংটনের এই কঠোর হুংকারকে অবশ্য খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পাল্টা এক বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই যে তারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তেহরানের মতে, বিশ্বের অনেক দেশই এখন যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা এবং একঘেয়ে সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজি নয়। এমনকি ইরানের রাজধানী তেহরানে বিশাল এক বিলবোর্ডে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে পানিতে ডুবতে থাকা অবস্থায় চিত্রায়িত করা হয়েছে। গালিবাফ দাবি করেছেন, ইরান গত কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে টিকে থাকার কৌশল শিখে গেছে এবং তাদের বাণিজ্যে বড় কোনো ধস নামানো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হবে না।

চীনের ভূমিকা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট বলেন, কোনো দেশই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নাগালের বাইরে নয়। চীনের বড় বড় ব্যাংকগুলো কেন এখনো তালিকায় নেই, এমন প্রশ্নে তিনি ইঙ্গিত দেন যে বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চলছে। তবে প্রয়োজনে চীনের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে একটুও কার্পণ্য করবে না ওয়াশিংটন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো যদি ইরানের পাশে শক্তভাবে দাঁড়ায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘অপারেশন’ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে বড় ধরণের সংশয় রয়েছে। কারণ ইরান বর্তমানে অনেক দেশের সাথে মার্কিন ডলারের বদলে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন শুরু করেছে।

এমন চরম উত্তেজনার মধ্যেই সোমবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে তেহরানে পৌঁছেছেন। তিনি সেখানে পৌঁছেই ইরানের স্পিকার গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ দেশটির শীর্ষ নেতাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের এই সফরকে বর্তমান সময়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ইরানের যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এই সফরের প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন বিশ্লেষণ।

পরিশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নিষেধাজ্ঞার ঢেউ বিশ্বজুড়ে এক ধরণের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তেলের বাজার থেকে শুরু করে ডিজিটাল কারেন্সি সবখানেই এর প্রভাব টের পাওয়া যাচ্ছে। যদি ইরান তার তেলের বাজার পুরোপুরি হারায়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ প্রায় ১০% থেকে ১৫% কমে যেতে পারে, যা জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী করে দেবে। অন্যদিকে, তেহরান যদি রাশিয়ার সাথে মিলে নতুন কোনো শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট গড়ে তোলে, তবে ওয়াশিংটনের এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে। সব মিলিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বৈরথ এখন এক চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ