যশোরে সাবেক এমপি শাহীন চাকলাদারসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা: ১৩ বছর পর আদালতের দ্বারস্থ ভুক্তভোগী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দীর্ঘ ১৩ বছর পর অবশেষে ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের দ্বারস্থ হলেন এক ভুক্তভোগী রাজনীতিবিদ। যশোরের রাজনীতিতে এক সময় অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে একটি ভয়াবহ হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়েছে। যশোর জেলা কৃষক দলের সাবেক সহ-সভাপতি নূরনবী এই মামলার বাদী। তাকে নির্মমভাবে মারধর করে হাত-পা ভেঙে ফেলা এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে পায়ের রগ কেটে দিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগে এই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) যশোরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই আবেদন জানানো হলে আদালত তা গ্রহণ করেন।

বাদী নূরনবী যশোর শহরের ঘোপ জেলরোড এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং দীর্ঘ দিন ধরে জেলা কৃষক দলের রাজনীতির সাথে যুক্ত। তার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় এক যুগ আগে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে তার ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছিল। সন্ত্রাসীরা তাকে কেবল মারধর করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তার পায়ের রগ কেটে দেয়। হামলার পর দীর্ঘ দিন তাকে হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে এবং তার শারীরিক সক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এতদিন তিনি মুখ খোলার সাহস পাননি বলে জানিয়েছেন।

এই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে যশোর-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারকে। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন যশোর সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও যুবলীগ নেতা তৌহিদুর রহমান ফন্টু চাকলাদার এবং যশোর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা যুবলীগ সভাপতি রেন্টু চাকলাদার। এছাড়া শফি ওরফে পাইপ শফি, কালাম, রুবেল ও রিন্টু নামের আরও ৪ জন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীকেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। আসামিদের সবাই স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং তাদের নির্দেশে এই হামলা চালানো হয়েছিল বলে নূরনবী তার এজাহারে উল্লেখ করেছেন।

মামলার শুনানি শেষে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জয় পাল বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেন। তিনি নূরনবীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন এবং কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অভিযোগটি তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা আদালতে নূরনবীর ওপর হওয়া হামলার সচিত্র বর্ণনা এবং শারীরিক জখমের প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছেন। তারা ১০০% আশাবাদী যে, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের আসল চেহারা সমাজের সামনে উন্মোচিত হবে এবং দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি পাবে।

১৩ বছর আগের এই ঘটনাটি কেন এখন সামনে এল, এমন প্রশ্নে নূরনবী জানান, তৎকালীন সময়ে শাহীন চাকলাদার ও তার বাহিনীর দাপটে পুরো যশোর শহর তটস্থ ছিল। ওই সময় থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি, উল্টো তাকে ও তার পরিবারকে গুম করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। জীবনের ভয়ে এতদিন তিনি চুপ করে থাকলেও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তিনি সাহস ফিরে পেয়েছেন। নূরনবীর দাবি, সেই হামলায় তার চিকিৎসার পেছনে গত কয়েক বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে, তবুও তিনি আর আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি।

হামলার শিকার নূরনবী বলেন, “সেদিন আমাকে যখন দা দিয়ে কোপানো হচ্ছিল, তখন আমি বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে একজন মানুষের হাত-পা ভেঙে রগ কেটে দেওয়া যে কতটা অমানবিক, তা কেবল আমিই জানি।” স্থানীয় বিএনপি ও কৃষক দলের নেতাকর্মীরা এই মামলার খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারা দাবি করেছেন, বিগত বছরগুলোতে যশোরের শত শত নেতাকর্মী এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নূরনবীর এই মামলাটি সফল হলে আরও অনেক ভুক্তভোগী বিচারের আশায় এগিয়ে আসবেন বলে তারা মনে করছেন।

বর্তমানে যশোর শহরে এই মামলাটিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক কৌতূহল ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যারা দীর্ঘদিন পার পেয়ে গেছেন, এবার তাদের আইনের মুখোমুখি হতে হবে। আদালত এই মামলার তদন্ত ভার পুলিশের ওপর দেওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন নিরপেক্ষ তদন্তের অপেক্ষায় আছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলার তদন্ত শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে করা হবে এবং কাউকে রাজনৈতিক কারণে ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে।

পরিশেষে, নূরনবীর এই আইনি লড়াই কেবল তার নিজের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়া প্রতিটি মানুষের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। ১৩ বছর পর শুরু হওয়া এই বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা দেখার অপেক্ষায় আছেন যশোরের সাধারণ জনতা। আদালতের এই পদক্ষেপের ফলে মানুষ আবারও আইনের শাসনের ওপর আস্থা ফিরে পাচ্ছে। নূরনবী আশা করেন, যারা তার জীবনের সোনালী সময় কেড়ে নিয়েছে এবং তাকে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু করেছে, তারা যেন আইনের হাত থেকে কোনোভাবেই পার না পায়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ