রাতে আলো জ্বালিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস? শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে ১০০% পর্যন্ত

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সুস্থ থাকার জন্য আমরা সাধারণত পুষ্টিকর খাবার আর ব্যায়ামের ওপর জোর দিই। কিন্তু একটি বিষয় আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই, তা হলো আমাদের ঘুমের পরিবেশ। অনেকেই আছেন যারা রাতে বেডসাইড ল্যাম্প, ডিম লাইট কিংবা টেলিভিশন চালিয়ে ঘুমান। আবার অনেকের অভ্যাস হলো ঘুমানোর ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭০% থেকে ৮০% শহরবাসী কোনো না কোনো কৃত্রিম আলোর মধ্যে রাত কাটান। কিন্তু আপনি কি জানেন, সামান্য এই আলোর উপস্থিতি আপনার শরীরের অভ্যন্তরীণ হরমোনের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে? চিকিৎসকদের মতে, অন্ধকারে ঘুমানো কেবল অভ্যাসের বিষয় নয়, এটি শরীরের জৈবিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

আমাদের শরীরের ভেতরে একটি অদৃশ্য ঘড়ি আছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সার্কাডিয়ান রিদম’। এই ঘড়িটি মূলত আলো আর অন্ধকারের ওপর ভিত্তি করে চলে। যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে, তখন আমাদের মস্তিষ্ক থেকে ‘মেলাটোনিন’ নামের একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনটি আমাদের শরীরকে সংকেত দেয় যে এখন বিশ্রামের সময়। কিন্তু ঘুমের সময় ঘরে যদি সামান্য আলোও থাকে, তবে মেলাটোনিন উৎপাদন প্রায় ৫০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে আপনার ঘুম গভীর হয় না এবং পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও শরীরে ক্লান্তি ভাব থেকে যায়। দীর্ঘদিনের এমন অভ্যাস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও কমিয়ে দিতে পারে।

শুধু ঘুম নয়, আলোর উপস্থিতিতে ঘুমালে শরীরে ‘কর্টিসল’ বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। কর্টিসল বেড়ে যাওয়া মানেই হলো শরীরে মানসিক চাপের সৃষ্টি হওয়া। এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে এবং ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। যারা নিয়মিত আলো জ্বালিয়ে ঘুমান, তাদের মধ্যে স্থূলতা বা ওজন বাড়ার ঝুঁকি ২০% থেকে ৩০% বেশি থাকে। এছাড়া হরমোনের এই অস্বাভাবিক ওঠানামা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ কিংবা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো বড় অসুখ ডেকে আনতে পারে। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গিয়ে ১০০০বা২০০০ডলার খরচ করার চেয়ে রাতে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও বুদ্ধিমানের কাজ।

নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনের এই ভারসাম্যহীনতা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য এবং মাসিক চক্র মেলাটোনিন ও কর্টিসলের ভারসাম্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ঘুমের নিয়মিত ব্যাঘাত ঘটলে পিরিয়ডে অনিয়ম কিংবা প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ৯৯% নারীই তাদের হরমোনাল সমস্যার পেছনে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুমের অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেন না। তাই সুস্থ থাকতে হলে কেবল ঘুমের সময় নয়, ঘুমের মান বা কোয়ালিটির দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। অন্ধকার ঘরে ঘুমানো নারীদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে।

স্মার্টফোন বা ট্যাবের নীল আলো আমাদের ঘুমের সবচেয়ে বড় শত্রু। এই নীল আলো সরাসরি চোখের রেটিনায় আঘাত করে এবং মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করে ফেলে। মস্তিষ্ক তখন মনে করে এখনো দিন আছে, ফলে মেলাটোনিন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায়। ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট আগে সব ধরনের ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা উচিত। অনেকেই বিছানায় শুয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিট ফোন দেখার কথা ভাবেন, কিন্তু সেই সময়টুকু কখন যে ১ ঘণ্টায় গড়ায় তা টের পাওয়া যায় না। এই অভ্যাসটি আপনার জৈবিক ঘড়িকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দেয়।

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও বর্তমান জীবনযাত্রায় ঘুমের জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ তৈরি করা খুব জরুরি। রাতে শোবার ঘরটি যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখুন। যদি পুরোপুরি অন্ধকারে আপনার ভয় লাগে বা অস্বস্তি হয়, তবে খুব সামান্য পাওয়ারের লাল বা কমলা রঙের জিরো বাল্ব ব্যবহার করতে পারেন, যা চোখের সরাসরি সংস্পর্শে আসবে না। এছাড়া ঘরের তাপমাত্রা যেন সহনীয় থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। গরমের দিনে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে ঘুম গভীর হয়। একটি শান্ত, শীতল এবং অন্ধকার ঘর আপনার শরীরের হরমোনগুলোকে ঠিকঠাক রাখতে সাহায্য করবে।

পরিশেষে বলা যায়, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য ছোট ছোট পরিবর্তনই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। আজ রাতেই পরীক্ষা করে দেখুন, সব আলো নিভিয়ে ঘুমানোর পর সকালে আপনি কতটা সতেজ বোধ করছেন। শরীরকে তার স্বাভাবিক ছন্দে চলতে দিন। মনে রাখবেন, একটি অন্ধকার ঘর মানে কেবল একটি অন্ধকার জায়গা নয়, এটি আপনার শরীরের পুনর্গঠন ও হরমোন রিচার্জ করার পাওয়ার স্টেশন। অযথা লাইট জ্বালিয়ে রেখে নিজের শরীরকে ঝুঁকির মুখে ফেলবেন না। নিয়ম মেনে গভীর ঘুমে ডুব দিন, সুস্থ থাকুন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ