চাঁপাইনবাবগঞ্জে সারের কারসাজি: বেশি দামে বিক্রি ও অবৈধ মজুদের দায়ে ডিলারকে ১ লাখ টাকা জরিমানা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সারের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টার দায়ে বড় ধরনের শাস্তির মুখে পড়েছেন এক অসাধু ডিলার। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে রাসায়নিক সার বিক্রি এবং অবৈধভাবে বিশাল পরিমাণ সার গুদামজাত করার অভিযোগে সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নে এই অভিযান চালানো হয়। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে হোসেনডাঙ্গা এলাকায় এই ঝটিকা অভিযানে ‘মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্স’ নামের একটি খুচরা সার ডিলারের দোকানে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। প্রশাসনের এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে। দীর্ঘ দিন ধরে সারের অতিরিক্ত দাম নিয়ে অভিযোগ থাকলেও এই প্রথম এমন কঠোর ব্যবস্থা নিল স্থানীয় প্রশাসন।

অভিযানটি পরিচালিত হয় সোমবার দুপুর ১:৩০ মিনিটের দিকে। সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইকরামুল হক নাহিদ এই ভ্রাম্যমাণ আদালতের নেতৃত্ব দেন। অভিযানে দেখা যায়, ডিলার মো. নুর ইসলাম (৫০) সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিলেন। তিনি হোসেনডাঙ্গা গ্রামের মো. নুরফসালীর ছেলে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসন জানতে পারে যে, এই ডিলার সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছেন। হাতে-নাতে প্রমাণ পাওয়ার পর আদালত ভোক্তা অধিকার ও কৃষি আইনে তাকে এই বড় অংকের জরিমানা করার আদেশ দেন।

শুধু বেশি দামে বিক্রিই নয়, ওই ডিলারের গুদামে তল্লাশি চালিয়ে বিশাল এক অবৈধ মজুদের সন্ধান পায় প্রশাসন। গুদাম থেকে মোট ২৫৯ বস্তা ইউরিয়া, ১০৬ বস্তা ডিএপি এবং ৪৫ বস্তা টিএসপি সার উদ্ধার করা হয়। বর্তমান সময়ে যখন কৃষকরা সারের জন্য হাহাকার করছেন, তখন এভাবে বস্তা বস্তা সার লুকিয়ে রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজারে সারের সংকট দেখিয়ে আকাশচুম্বী দাম পাওয়ার উদ্দেশ্যেই এই মজুদ গড়ে তোলা হয়েছিল। উদ্ধারকৃত এই ৪১০ বস্তা সারের বর্তমান বাজার মূল্য কয়েক লক্ষ টাকা। ডিলার নুর ইসলাম এই বিপুল পরিমাণ সার কেন রসিদ ছাড়া সংগ্রহ করেছেন, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

জরিমানা করার পাশাপাশি প্রশাসন আরও একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উদ্ধার করা এই বিশাল পরিমাণ সার যাতে দ্রুত কৃষকদের হাতে পৌঁছায়, সেজন্য তা উন্মুক্ত বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝিলিম ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যে, তিনি এই সব সার সরকার নির্ধারিত মূল্যে অর্থাৎ ১০০% ন্যায্য দামে সাধারণ কৃষকদের কাছে বিক্রি করবেন। বিক্রির পর যে অর্থ সংগৃহীত হবে, তা পরে নিয়ম অনুযায়ী ডিলারকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এতে এলাকার সারের সংকট অনেকটাই কেটে যাবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

এই সফল অভিযানে সদর উপজেলা কৃষি বিভাগ এবং সদর মডেল থানা পুলিশের একদল সদস্য সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন। স্থানীয় কৃষকদের মতে, সারের ডিলাররা প্রায়ই সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেয়। একটি সাধারণ হিসাবে দেখা গেছে, সারের সঠিক দামের ওপর কৃষকের প্রায় ৪০% থেকে ৫০% উৎপাদন খরচ নির্ভর করে। তাই সারের দাম বাড়লে সরাসরি কৃষকের লাভ কমে যায়। হোসেনডাঙ্গা এলাকার এক কৃষক জানান, “আমরা সারের বস্তায় নির্ধারিত দামের চেয়েও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে আসছিলাম। আজকের এই ১ লাখ টাকা জরিমানার খবরে আমরা খুব খুশি। এমন অভিযান চললে কেউ আর কৃষকদের ঠকাতে পারবে না।”

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইকরামুল হক নাহিদ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সারের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কোনো ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা যদি সরকারি দরের চেয়ে ১ টাকাও বেশি নেয়, তবে তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের নজরদারি ১০০% বাড়ানো হয়েছে। যারা কৃষকদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে, তাদের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগামী দিনগুলোতেও এমন অভিযান নিয়মিতভাবে জেলার প্রতিটি বাজারে চলবে।

বর্তমানে আমন চাষের ভরা মৌসুম হওয়ায় সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই সময়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের এমন কারসাজি কৃষকদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিলার নুর ইসলামের ওপর ১ লাখ টাকার এই জরিমানা কেবল শাস্তি নয়, বরং অন্য অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন তারা সারের বস্তা কেনার সময় অবশ্যই রসিদ সংগ্রহ করেন এবং কোনো অসংগতি দেখলে সাথে সাথে কৃষি অফিস বা হটলাইনে জানান। সাধারণ মানুষের সজাগ দৃষ্টি থাকলে এমন দুর্নীতি রোধ করা সহজ হবে।

পরিশেষে, সোমবারের এই সফল অভিযান চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রশাসনের এমন কঠোর অবস্থান যদি মাঠ পর্যায়ে বজায় থাকে, তবে সারের বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। সারের সঠিক বণ্টন ও দাম নিশ্চিত করতে পারলে কৃষকরা লাভবান হবেন এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এলাকাবাসী প্রশাসনের এই সাহসী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং নিয়মিত বাজার তদারকির দাবি তুলেছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ