যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের জন্য দুঃসংবাদ: এইচ-১বি ও ওপিটি ভিসার ফি এক লাফে ১ লাখ ডলার করার পরিকল্পনা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যুক্তরাষ্ট্রে যারা দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করতে চান বা পড়াশোনা শেষ করে সেখানে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এক বিশাল দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় এইচ-১বি (H-1B) ভিসার ফি বাড়িয়ে ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার করার একটি নতুন প্রস্তাব আনা হয়েছে। আজ সোমবার মার্কিন ফেডারেল রেজিস্টার থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি জানা গেছে। শুধু তাই নয়, যারা শিক্ষার্থী হিসেবে এফ-১ (F-1) ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, তাদের জন্য অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং বা ওপিটি (OPT) কর্মসূচিতে অংশ নিতেও এখন থেকে প্রায় ১ লাখ ডলার ফি দিতে হতে পারে। এই বিপুল অংকের ফি বাড়ানোর প্রস্তাব কার্যকর হলে সাধারণ কর্মীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

প্রস্তাবিত এই নতুন নিয়মটি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার খরচ অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে যাবে। সাধারণত কোনো কোম্পানি যখন একজন বিদেশি দক্ষ কর্মীকে নিয়োগ দেয়, তখন সেই ভিসার খরচ কোম্পানিকেই বহন করতে হয়। এখন যদি একটি ভিসার পেছনেই ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার খরচ করতে হয়, তবে অনেক ছোট ও মাঝারি কোম্পানি আর বিদেশি কর্মী নিতে উৎসাহিত হবে না। অভিবাসনবিষয়ক নামী প্রতিষ্ঠান ফ্র্যাগোমেন জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে যাওয়া হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেবে। এই ফি বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় প্রায় কয়েক হাজার শতাংশ বেশি, যা কোনোভাবেই স্বাভাবিক মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।

সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে পারেন দক্ষিণ এশীয়রা, বিশেষ করে ভারতীয়রা। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসার সুবিধাভোগীদের প্রায় ৭০% এর বেশি মানুষ ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ২০২৪ সালের একটি সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা (USCIS) মোট ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৪০২টি এইচ-১বি আবেদন অনুমোদন করেছিল। এর মধ্যে ৭১% আবেদনকারীই ছিলেন ভারতীয়। স্বাভাবিকভাবেই এই বিশাল ফি বৃদ্ধির ঘোষণা ভারতীয় ও তার আশপাশের দেশগুলোর মেধাবী কর্মীদের ওপর একটি বড় ধরণের অর্থনৈতিক ধাক্কা হিসেবে আসবে। অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো দক্ষ বিদেশিদের নিরুৎসাহিত করে স্থানীয়দের জন্য কাজের সুযোগ বাড়ানো।

শিক্ষার্থীদের জন্য ওপিটি (OPT) কর্মসূচিটি যুক্তরাষ্ট্রে থাকার একটি বড় লাইফলাইন হিসেবে কাজ করে। পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাজ করার অনুমতি পান। ফ্র্যাগোমেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (DHS) এই ওপিটি আবেদনের জন্য ১ লাখ ডলার ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। আগে এই ফি ছিল খুবই সামান্য, যা একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল। কিন্তু এখন যদি ১ লাখ ডলার অর্থাৎ বর্তমান বাজারে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে ওপিটি নিতে হয়, তবে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীই পড়াশোনা শেষ করে নিজ দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হবেন। এটি আমেরিকার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ভিসার ফি বাড়ানোর পাশাপাশি আরও একটি ভয়ংকর প্রস্তাব করেছে ডিএইচএস (DHS)। বর্তমানে কোনো এইচ-১বি ভিসাধারী কর্মীর চাকরি চলে গেলে তিনি নতুন চাকরি খোঁজার জন্য ৬০ দিনের একটি ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা অতিরিক্ত সময় পান। এই সময়ের মধ্যে তিনি অন্য কোনো কোম্পানিতে যোগ দিয়ে তার ভিসাটি বহাল রাখতে পারেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন প্রস্তাবে এই ৬০ দিনের সুযোগটি বাতিলের কথা বলা হয়েছে। এর মানে হলো, আজ যদি কারো চাকরি চলে যায়, তবে তাকে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হতে পারে। এই নিয়মটি কার্যকর হলে অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে সবসময় একটি ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক বিরাজ করবে এবং তারা নিয়োগকর্তাদের কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়বেন।

মার্কিন প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাসী। তারা চায় না বিদেশিরা এসে আমেরিকার ভালো ভালো চাকরিগুলো দখল করুক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি বা বড় বড় টেক কোম্পানিগুলো এই বিদেশি দক্ষ কর্মীদের ওপর অন্তত ৮০% থেকে ৯০% নির্ভরশীল। যদি ১ লাখ ডলারের বেশি ফি দিয়ে কর্মী নিতে হয়, তবে মাইক্রোসফট, গুগল বা অ্যামাজনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বড় ধরণের আর্থিক চাপ পড়বে। এতে অনেক কোম্পানি তাদের অপারেশন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে।

সাম্প্রতিক মার্কিন জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ৫২ লাখের বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করছেন। এছাড়া বাংলাদেশিদের সংখ্যাও এখন কয়েক লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই এইচ-১বি এবং ওপিটি সুবিধার আওতায় রয়েছেন। প্রস্তাবিত এই নিয়মগুলো এখন হোয়াইট হাউসের অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেটের (OMB) পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। যদি এই প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়, তবে এটি আমেরিকার অভিবাসন ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আইনি লড়াই শুরু হতে পারে, কারণ এটি মুক্ত বাজার অর্থনীতির পরিপন্থী।

পরিশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ কর্মী হিসেবে যাওয়া এখন কেবল মেধার বিষয় নয়, বরং বিশাল অংকের টাকার বিষয়ে পরিণত হতে যাচ্ছে। যারা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকায় পড়তে যান, তাদের জন্য এই ১ লাখ ডলারের বাধা অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব হবে। এটি কেবল একটি ফি বৃদ্ধি নয়, বরং পরোক্ষভাবে দক্ষ অভিবাসীদের জন্য আমেরিকার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার একটি কৌশল। আগামী কয়েক মাস আমেরিকার অভিবাসন রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ এবং বড় কোম্পানিগুলো এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কী ভূমিকা নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ