যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনের নিউহ্যাম এলাকায় এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন মাছুম আহমদ নামের এক বাংলাদেশি প্রবাসী। গত মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখ স্থানীয় সময় ভোররাত ৩টার দিকে সেন্ট বার্থোলোমিউস রোডে এই নৃশংস ঘটনা ঘটে। ৪০ বছর বয়সী মাছুমকে তার নিজের গাড়ির ভেতরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকরা তাকে ঘটনাস্থলেই মৃত ঘোষণা করেন। এই খবর জানাজানি হওয়ার পর লন্ডনের বাঙালি কমিউনিটি এবং মাছুমের গ্রামের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথে গভীর শোক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত মাছুম আহমদের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কারিকোনা গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মোহাম্মদ আমির আলীর বড় ছেলে। ছোটবেলা থেকেই মাছুম লন্ডনে বেড়ে উঠেছেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। জীবনের প্রায় ১০০% সময় প্রবাসে কাটালেও মাছুম মাঝেমধ্যে জন্মভূমি বাংলাদেশে আসতেন। তার আড়াই বছর বয়সী একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মাছুমের বাবা ছাড়া পরিবারের অন্য ৫ থেকে ৬ জন সদস্য সবাই বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। এমন একটি সাজানো গোছানো পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা।
মাছুমের ছোট ভাই মানিক উদ্দিন এই হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে হুট করে পুলিশ তাদের বাসায় কড়া নাড়ে। পুলিশ সদস্যরা প্রথমে মাছুমের পরিচয় নিশ্চিত হতে চান এবং তার একটি ছবি দেখতে চান। পরিবারের লোকজন ছবি দেখানোর পর পুলিশ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে জানায় যে, মাছুম আহমদ আর বেঁচে নেই। ঘাতকদের গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে। মানিক উদ্দিন বলেন, “আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারছি না কেন আমার ভাইকে মারা হলো। তার তো কারো সাথে কোনো শত্রুতা থাকার কথা নয়।” বর্তমানে মাছুমের মরদেহ পুলিশি হেফাজতে রয়েছে এবং ময়নাতদন্তের পর তা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমেছে এবং তারা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। পুলিশের প্রাথমিক তথ্যমতে, রাত ৩টার দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা গুলির শব্দ শুনে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশের সাথে সাথে লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এবং একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ধরে তাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি। পুলিশ এই ঘটনার পর সেন্ট বার্থোলোমিউস রোড এলাকাটি পুরোপুরি ঘিরে রেখেছে এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা আলামত সংগ্রহ করছেন। পুলিশ এই মামলার রেফারেন্স নম্বর হিসেবে ‘সিএডি ৭৯৭/১৮এইউজি’ (CAD 797/18AUG) ব্যবহার করছে।
তদন্তের দায়িত্বে থাকা ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেক্টর ড্যান হুইটেন নিহতের স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন যে, এই ঘটনাটি স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রায় ৮০% থেকে ৯০% পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে এবং এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে। তবে এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় ১টিও গ্রেপ্তার বা আটকের খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশ বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে যে, মঙ্গলবার ভোরে যারা ওই এলাকা দিয়ে চলাচল করেছেন বা কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখেছেন, তারা যেন দ্রুত পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেন।
লন্ডনের এই এলাকায় বাংলাদেশিদের বসবাস অনেক বেশি। এমন একটি জনাকীর্ণ জায়গায় গাড়ির ভেতরে একজনকে গুলি করে মেরে ফেলার ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, লন্ডনে অপরাধের মাত্রা গত কয়েক বছরে অন্তত ১০% থেকে ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার শিকার হচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরাও। মাছুমকে লক্ষ্য করেই গুলি চালানো হয়েছিল নাকি এটি কোনো ভুল বোঝাবুঝির ফল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে গোয়েন্দারা মাদক বা গ্যাং কালচারের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন।
এদিকে সিলেটের বিশ্বনাথের কারিকোনা গ্রামে মাছুমের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছালে সেখানে শোকের মাতম শুরু হয়। পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনরা আমির আলীর বাড়িতে ভিড় করছেন। গ্রামের মানুষ বলছেন, মাছুম খুবই শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। আড়াই বছরের ছোট্ট মেয়েটি তার বাবার আদর থেকে সারা জীবনের জন্য বঞ্চিত হলো, এটা মেনে নেওয়া কঠিন। স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছেন, যেন ব্রিটিশ সরকার এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে এবং খুনিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনে।
লন্ডন পুলিশ আশ্বস্ত করেছে যে, তারা এই মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে ১০০% শ্রম দিচ্ছে। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মাছুমের পরিবারকে নিয়মিত কাউন্সিলিং ও সহায়তা প্রদান করছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও লন্ডনের রাস্তায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের কাছে জোর দাবি তুলেছেন। একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবনের আশায় যারা বিদেশে পাড়ি জমান, তাদের এমন অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। মাছুম আহমদের এই বিয়োগান্তক ঘটনা আবারও প্রবাসে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।
















