নরসিংদীর পলাশে লরির ধাক্কায় প্রাণ হারালেন টেক্সটাইল শ্রমিক: ঘাতক চালক পলাতক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলায় আজ মঙ্গলবার সকালে এক অত্যন্ত করুণ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ইটবোঝাই একটি দ্রুতগামী লরির ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন সেলিম মিয়া (৪২) নামের এক সাধারণ শ্রমিক। তিনি প্রতিদিনের মতো সকালেই তার কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মাঝপথেই ঘাতক লরি তার জীবন কেড়ে নেয়। ডাংগা ইউনিয়নের তেপোথা এলাকায় সকাল ৭টা ৩০ মিনিটের দিকে এই ঘটনা ঘটে। এই অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

নিহত সেলিম মিয়া ডাংগা ইউনিয়নের সান্তানপাড়া গ্রামের মিয়াজিগাঁও এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তার বাবার নাম মৃত আয়ুব আলী। তিনি স্থানীয় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান চরকা টেক্সটাইল মিলের একজন নিয়মিত শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। সেলিম মিয়ার মৃত্যুতে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এলাকাবাসী জানান, সেলিম খুব পরিশ্রমী এবং অমায়িক মানুষ ছিলেন। তার পরিবার এখন ১০০% অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে সেলিম মিয়া তার পুরনো সাইকেলটি নিয়ে কাজে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি যখন ডাংগা-পাঁচদোনা সড়কের তেপোথা নামক স্থানে পৌঁছান, তখনই পেছন থেকে আসা একটি ইটবোঝাই ট্রলি তাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে সেলিম মিয়া ছিটকে পড়ে যান এবং লরির চাকার নিচে পিষ্ট হন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনাকবলিত সাইকেলটি দুমড়েমুচড়ে গেছে, যার আনুমানিক ক্ষতি প্রায় $৪০ থেকে $৫০ ডলারের সমান।

ঘটনার পরপরই ঘাতক ট্রলির চালক গাড়িটি রাস্তার পাশে ফেলে রেখে দ্রুত পালিয়ে যান। স্থানীয় জনতা ছুটে আসলেও চালককে ধরতে সক্ষম হননি। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন যে, এই সড়কে প্রায়ই ফিটনেসবিহীন লরি ও ট্রলি বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। চালকদের অদক্ষতা এবং ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করার কারণে প্রায় ২০% সড়ক দুর্ঘটনা এই এলাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশ খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।

পলাশ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মামুন গণমাধ্যমকে জানান, আমরা খবর পেয়ে দ্রুত তেপোথা এলাকা থেকে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করেছি। প্রাথমিকভাবে এটি একটি সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে বিশেষ আবেদন জানানো হয়েছিল যেন মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে এবং আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘাতক লরিটি বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে এবং চালককে ধরার চেষ্টা চলছে।

চরকা টেক্সটাইল মিলের সহকর্মীরা সেলিমের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। তারা বলছেন, সাধারণ শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। অথচ সড়কে তাদের নিরাপত্তার কোনো বালাই নেই। গত এক বছরে এই নির্দিষ্ট সড়কে দুর্ঘটনা ১০% থেকে ১৫% বেড়ে গেছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। অনেক সময় শ্রমিকরা চিকিৎসা ব্যয়ের অভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন, আবার অনেকে সেলিমের মতো লাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন। সেলিমের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য কোম্পানি কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন শ্রমিকরা।

এই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ডাংগা এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় লোকজন ও অন্যান্য শ্রমিকরা তেপোথা এলাকায় জড়ো হয়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা ভারি যানবাহন বিশেষ করে ইটবোঝাই ট্রলি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তারা বলেন, যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে আগামীতে আরও অনেক প্রাণ ঝরে যাবে। প্রশাসনকে ১০০% কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তারা যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোক সইতে না হয়।

বিকেলের দিকে সেলিম মিয়ার জানাজা শেষে তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন এবং তাদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই একটি দুর্ঘটনাই একটি সাজানো সংসারকে তছনছ করে দিল। সড়ক নিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করলে এমন প্রাণহানি চলতেই থাকবে। প্রশাসনের উচিত অতিদ্রুত ঘাতক চালককে আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যাতে ভবিষ্যতে অন্য চালকরা সাবধান হয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ