চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ সীমান্তে আবারও বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে ৫৯ বিজিবি (মহানন্দা ব্যাটালিয়ন)। চোরাচালান ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার ভোরে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বিজিবি সদস্যরা। এই অভিযানে প্রায় ২৫,০০,০০০ টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ ভারতীয় ট্রাকের যন্ত্রাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আনা এই পণ্যগুলো দেশের বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল চোরাকারবারীদের, যা বিজিবির তৎপরতায় নস্যাৎ হয়ে যায়।
বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, তারা আগে থেকেই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়েছিলেন যে একটি বড় চালান অবৈধ পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখ ভোর ঠিক ৫:০০ ঘটিকায় অভিযান শুরু হয়। মহানন্দা ব্যাটালিয়নের সোনামসজিদ বিওপির (বর্ডার আউটপোস্ট) একটি চৌকস টহল দল এই অভিযানে নেতৃত্ব দেয়। তারা শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের কয়লাবাড়ী ট্রাক টার্মিনাল এলাকায় এই অতর্কিত হানা দেয়।
সীমান্ত পিলার ১৮৪/২-এস থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার ভেতরে বাংলাদেশের সীমানায় এই টার্মিনালটি অবস্থিত। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারীরা মালামাল ফেলে দ্রুত পালিয়ে যায়। ফলে অভিযানে সরাসরি কোনো আসামী ধরা না পড়লেও, মালিকবিহীন অবস্থায় ২০০ পিস বিভিন্ন প্রকার ট্রাকের যন্ত্রাংশ জব্দ করতে সক্ষম হন বিজিবি সদস্যরা। উদ্ধার হওয়া এই যন্ত্রাংশগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য ২৫ লাখ টাকা, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় $২১,০০০ ডলারের সমান।
বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় সীমান্ত দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য আসা রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। বিজিবি এই দায়িত্বটি ১০০% নিষ্ঠার সাথে পালন করছে। জব্দ করা যন্ত্রাংশগুলো বর্তমানে বিজিবির হেফাজতে রয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী এগুলোকে দ্রুত কাস্টমস অফিসে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সেই সাথে এই পাচার চক্রের সাথে কারা জড়িত এবং এই মালামাল কার গোডাউনে যাওয়ার কথা ছিল, তা খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ শুরু করেছে।
উল্লেখ্য যে, চলতি আগস্ট মাসের শুরু থেকেই এই এলাকায় বিজিবির নজরদারি অনেক বেশি জোরদার করা হয়েছে। এর আগে গত ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখেও একই ইউনিয়নের বালিয়াদিঘী এলাকার তালতলা নামক স্থানে একটি বড় অভিযান চালিয়েছিল ৫৯ বিজিবি। সে সময় একটি গোডাউনের পাশ থেকে ২৯১ পিস ভারতীয় ট্রাকের যন্ত্রাংশ উদ্ধার করা হয়েছিল। একের পর এক এমন বড় বড় চালান ধরা পড়ায় এটা স্পষ্ট যে, চোরাকারবারীরা এই রুটটিকে তাদের নিরাপদ পথ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
৫৯ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী এই অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, সীমান্তে কোনো প্রকার অবৈধ কাজ চলতে দেওয়া হবে না। আমরা মাদক এবং চোরাচালান নির্মূলে শতভাগ অঙ্গীকারবদ্ধ। চোরাকারবারীদের জন্য আমাদের কোনো ছাড় নেই। তিনি আরও যোগ করেন, যারা দেশের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এসব পণ্য আনছে, তাদের ধরতে বিজিবির এই ধরনের অভিযান আগামী দিনগুলোতেও নিয়মিত বিরতিতে অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কয়লাবাড়ী ট্রাক টার্মিনাল এলাকাটি ভোরের দিকে বেশ নির্জন থাকে। এই সুযোগটিই কাজে লাগাতে চেয়েছিল চোরাচালান চক্র। তবে বিজিবির গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়ায় চোরাকারবারীরা তাদের মিশন সম্পন্ন করতে পারেনি। বিজিবির এই সাফল্যে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মাঝেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। এলাকার সচেতন মানুষ মনে করেন, সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমন কঠোর থাকলে চোরাচালান ০% এ নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মহানন্দা ব্যাটালিয়নের এই বিশেষ অভিযানটি শিবগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় অপরাধীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। গোপন গোডাউন বা ট্রাক টার্মিনাল যেখানেই অবৈধ মালামাল রাখা হোক না কেন, বিজিবি তা খুঁজে বের করবেই। দেশের সীমান্ত রক্ষা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে চোরাচালানের হাত থেকে বাঁচাতে ৫৯ বিজিবির এমন কঠোর অবস্থান সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। ভবিষ্যতে সীমান্ত সুরক্ষায় সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও প্রত্যাশা করে বিজিবি।
















