শিবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির অভিযান: দামী মোটরসাইকেল ও ভারতীয় মাদকসহ যুবক আটক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলাটি বরাবরই চোরাচালান প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। তবে মাদক ও চোরাচালান বন্ধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের অভিযান আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি) এক বিশেষ অভিযান চালিয়েছে। এই অভিযানে ১৮ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ এসকাফ সিরাপ এবং একটি দ্রুতগামী মোটরসাইকেলসহ মো. সেরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে আটক করেছে বিজিবি। শিবগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় মাদকের এই আনাগোনা বন্ধ করতে বিজিবির টহল দল এখন আগের চেয়ে ২০% থেকে ৩০% বেশি সক্রিয় রয়েছে।

বিজিবি সূত্র থেকে জানা গেছে, ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখ সোমবার সকালের দিকে তারা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পান যে, একটি মাদকের চালান মোটরসাইকেলযোগে পাচার হতে যাচ্ছে। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মহানন্দা ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ তেলকুপি বিওপির একটি বিশেষ টহল দল দ্রুত অভিযানে নামে। আনুমানিক সকাল ১১:০০ টার দিকে তারা শিবগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের টাপ্পুর আম বাগান এলাকায় অবস্থান নেয়। জায়গাটি সীমান্ত পিলার ১৮০/২-এস থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার ভেতরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত। সেখানে বিজিবি সদস্যরা চোরাকারবারীদের ধরার জন্য বেশ কিছুক্ষণ ধূর্ততার সাথে ওঁৎ পেতে থাকেন।

কিছুক্ষণ পর ওই এলাকা দিয়ে একটি মোটরসাইকেল দ্রুতগতিতে আসার সময় বিজিবি সদস্যরা সেটিকে থামার সংকেত দেন। মোটরসাইকেল চালক পালানোর চেষ্টা করলেও টহল দলের সদস্যরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে আটক করতে সক্ষম হন। আটক ব্যক্তির নাম মো. সেরাজুল ইসলাম, তার বয়স বর্তমানে ৩৫ বছর। তিনি শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের জমিনপুর গ্রামের মো. শরিফুল ইসলামের ছেলে। বিজিবি জানায়, সেরাজুল দীর্ঘ দিন ধরে এই পথে ছোটখাটো মাদকের চালান পাচার করে আসছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তবে আজ তিনি বিজিবির নিশ্ছিদ্র নজরদারি এড়াতে পারেননি।

আটকের পর সেরাজুলের দেহ এবং তার সাথে থাকা মোটরসাইকেলটিতে তল্লাশি চালায় বিজিবি। এ সময় তার হেফাজত থেকে ১৮ বোতল ভারতীয় নেশাজাতীয় এসকাফ (Eskuf) সিরাপ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তার ব্যবহৃত নীল রঙের অ্যাপাচি আরটিআর ১৬০ সিসি (Apache RTR-160 cc) মোটরসাইকেলটিও জব্দ করা হয়। এই ধরনের দামী মোটরসাইকেল চোরাকারবারীরা মূলত দ্রুত পালানোর কাজে ব্যবহার করে থাকে। জব্দ করা এই মোটরসাইকেলটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২,৫০,০০০ টাকার বেশি, যা ডলারে রূপান্তর করলে প্রায় $২০৮০ ডলারের মতো দাঁড়ায়। মাদকসহ এই মালামালগুলো এখন পুলিশের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

ভারত থেকে আসা এই এসকাফ সিরাপ বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এই মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে বিজিবি ১০০% একাগ্রতা নিয়ে কাজ করছে। শিবগঞ্জ সীমান্তের বিভিন্ন দুর্গম পয়েন্ট দিয়ে এসব মাদক পাচারের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু বিজিবির কঠোর পাহারায় তা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। আটক হওয়া সেরাজুলের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা করার প্রস্তুতি চলছে এবং জব্দ হওয়া মালামাল সংশ্লিষ্ট থানায় সোপর্দ করার কার্যক্রম বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

৫৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী এই অভিযানের বিষয়ে সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের সীমান্ত সুরক্ষায় কোনো প্রকার আপস নেই। বিশেষ করে মাদক আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, তাই এর বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি সব সময় বজায় থাকবে। বিজিবি সদস্যরা দিনরাত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দেশের অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করে যাচ্ছেন। সীমান্ত এলাকা দিয়ে যাতে একটিও মাদকের বোতল বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে, সে জন্য আমরা সব সময় সজাগ আছি এবং আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।

স্থানীয় আম বাগান মালিকরা জানিয়েছেন, বাগানগুলো বেশ বড় হওয়ায় এবং গাছপালার আড়াল থাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা এই এলাকাকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে বিজিবি এখন ড্রোন এবং আধুনিক গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে এসব দুর্গম জায়গায় নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। এতে এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের আনাগোনা আগের চেয়ে প্রায় ৪০% কমে গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তারা চান, এলাকায় মাদকের এই অবৈধ কারবার যেন চিরতরে বন্ধ হয় এবং তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকে। বিজিবির এমন অভিযানে সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, শিবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির এই ধরনের ছোট কিন্তু নিয়মিত অভিযানগুলো অপরাধীদের মনে এক ধরণের ভীতি তৈরি করেছে। সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি চোরাচালান প্রতিরোধে স্থানীয়দেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে বিজিবি। বর্তমানে আটক সেরাজুল ইসলামকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিজিবির এই কঠোর অবস্থান ও টহল যদি নিয়মিত চলতে থাকে, তবে শিবগঞ্জ সীমান্ত অচিরেই একটি নিরাপদ ও সম্পূর্ণ মাদকভুক্ত এলাকায় পরিণত হবে বলে সাধারণ মানুষ আশা করছেন। দেশের স্বার্থে বিজিবির এই লড়াই আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ