চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সদর মডেল থানা পুলিশ গত সোমবার রাতে একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ তিনজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে। নবাবগঞ্জ পৌরসভার আজাইপুর পুকুরপাটান এলাকায় এই ঝটিকা অভিযানটি চালানো হয়। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা দীর্ঘ দিন ধরে এলাকায় নেশাজাতীয় এই বিষাক্ত মাদক বিক্রি করে আসছিলেন। অভিযানে মাদকের পাশাপাশি মাদক বিক্রির নগদ ১৬,৬০০ টাকাও উদ্ধার করা হয়েছে। এই সফল অভিযানে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং পুলিশের এই তৎপরতাকে অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন।
পুলিশ সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখ সোমবার রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে এই অভিযান পরিচালিত হয়। জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এর বিশেষ দিকনির্দেশনায় এবং সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই কার্যক্রম চলে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন এসআই (নিরস্ত্র) ওমর ফারুক ও তার একটি চৌকস টিম। পুলিশ আগে থেকেই খবর পেয়েছিল যে আজাইপুর এলাকায় একটি বড় মাদকের কেনাবেচা চলছে। এই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ ওই এলাকার মাদক ব্যবসায়ী মোসাঃ রাজিয়া বেগমের বসতবাড়িতে আকস্মিক হানা দেয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলেও তিনজনকে ঘটনাস্থলেই আটকে ফেলে ফোর্স।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তারা হলেন—নবাবগঞ্জ পৌরসভার আজাইপুর গ্রামের মৃত বুলুর স্ত্রী মোসাঃ রাজিয়া বেগম (৪৭), মাঝপাড়া বালিগ্রাম এলাকার মৃত তরিকুল ইসলামের ছেলে মোঃ মফিজুল (৫০), এবং রাজিয়া বেগমের মেয়ে মোসাঃ রুমি বেগম (২৭)। পুলিশ জানিয়েছে, রাজিয়া বেগম নিজের বাড়িতে বসেই মাদকের এই কারবার নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার মেয়ে রুমি বেগমও এই অপরাধের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে মফিজুল মাদক সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করতেন বলে প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এই তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পুলিশ আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে যাতে এই চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা যায়।
অভিযানের সময় গ্রেপ্তারকৃতদের তল্লাশি করে তাদের হেফাজত থেকে মোট ১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়। বর্তমান বাজারে এই পরিমাণ হেরোইনের মূল্য কয়েক লাখ টাকা। এছাড়া পুলিশ মাদক বিক্রির নগদ ১৬,৬০০ টাকা জব্দ করেছে, যা মার্কিন ডলারে রূপান্তর করলে প্রায় $১৩৮ ডলারের কাছাকাছি দাঁড়ায়। মাদক বিক্রির এই লভ্যাংশ ওই দিনই তারা সংগ্রহ করেছিলেন বলে পুলিশ ধারণা করছে। উদ্ধারকৃত মাদকগুলো ল্যাবরেটরি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে এবং জব্দকৃত টাকা বর্তমানে সরকারি কোষাগারে জমা করার প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশের এই অভিযানটি এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের আইনগত প্রক্রিয়া শেষে আদালতে পাঠানোর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এলাকায় মাদকের বিস্তার রোধে তারা ১০০% কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনো প্রভাবশালী মহলের দোহাই দিয়ে কেউ পার পাবে না। পুলিশের এই ধরনের বিশেষ অভিযান আগামী দিনগুলোতেও নিয়মিত বিরতিতে চালানো হবে যাতে তরুণ সমাজকে মাদকের এই ভয়াবহ মরণনেশা থেকে রক্ষা করা যায়।
মাদকের এই অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ সাধারণ জনগণকে অনুরোধ জানিয়েছে, যদি কারো কাছে মাদক সংক্রান্ত কোনো গোপন তথ্য থাকে তবে তা যেন দ্রুত পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে। পুলিশের লক্ষ্য হচ্ছে সমাজের অন্তত ৯০% অপরাধ কমিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আজাইপুরের এই অভিযানের ফলে এলাকার সাধারণ মানুষ আশা করছেন যে, খুব শীঘ্রই তাদের এলাকাটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত হবে।
বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে পুলিশ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে কেবল অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। অভিভাবকরা যদি তাদের সন্তানদের গতিবিধি সম্পর্কে ১০০% সচেতন থাকেন, তবে মাদক ব্যবসায়ীরা কোনো সুযোগ পাবে না। আজকের এই অভিযানে ১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার হওয়াটি ছোট বিষয় নয়, কারণ এর প্রতিটি গ্রাম শত শত তরুণকে বিপথগামী করতে পারত। পুলিশ জানিয়েছে, তারা এই জেলার প্রতিটি অলিগলিতে নজরদারি বাড়িয়েছে যাতে চোরাকারবারীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।
গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে সোপর্দ করার পর রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ আরও খতিয়ে দেখছে যে এই হেরোইনের উৎস কোথায় এবং এটি সীমান্ত দিয়ে কীভাবে এই এলাকায় প্রবেশ করেছে। মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রেখে পুলিশ তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার এই সফল অভিযান মাদক ব্যবসায়ীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিবে বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ জনগণ এখন নির্ভয়ে পুলিশকে তথ্য দিতে শুরু করেছেন, যা অপরাধ দমনে বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
















