বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর মানেই বিশ্বজুড়ে এক অন্যরকম উন্মাদনা। প্রতিটি দল যেমন শিরোপা জয়ের জন্য মরণপণ লড়াই করে, তেমনি খেলোয়াড়দের মধ্যেও থাকে ব্যক্তিগত অর্জনের এক নীরব প্রতিযোগিতা। বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলোর একটি হলো ‘গোল্ডেন বুট’, যা টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি গোল করা খেলোয়াড়কে দেওয়া হয়। এবারের বিশ্বকাপেও গোল্ডেন বুট জেতার লড়াইটা বেশ জমে উঠেছে। গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে টুর্নামেন্ট যত সামনের দিকে এগোচ্ছে, এই লড়াইয়ের উত্তেজনা যেন ততটাই বাড়ছে। গোলদাতাদের শীর্ষ তালিকায় এবার রাজত্ব করছেন বর্তমান বিশ্বের সেরা দুই তারকা—কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং লিওনেল মেসি।
বর্তমান গোলদাতাদের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, ফ্রান্সের তরুণ সেনসেশন কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি উভয়েই ৭টি করে গোল করে তালিকার একেবারে শীর্ষে যৌথভাবে অবস্থান করছেন। এমবাপ্পে তার গতির ঝলক এবং নিখুঁত ফিনিশিং দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে রীতিমতো তছনছ করে দিচ্ছেন। অন্যদিকে, মেসি তার স্বভাবসুলভ জাদুকরী ড্রিবলিং এবং নিখুঁত ফ্রি-কিকের মাধ্যমে প্রমাণ করে চলেছেন যে বয়স তার কাছে একটি সংখ্যা মাত্র। এই দুই তারকার মধ্যে গোল্ডেন বুট জেতার লড়াইটা দর্শকদের কাছে প্রতিটি ম্যাচকেই আরও অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তুলছে।
শীর্ষ দুজনের ঠিক পেছনেই আছেন নরওয়ের গোলমেশিন খ্যাত আর্লিং হলান্ড এবং ইংল্যান্ডের নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। দুজনেই এখন পর্যন্ত ৫টি করে গোল করে তালিকায় যৌথভাবে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। হলান্ড তার শারীরিক সক্ষমতা এবং বক্সের ভেতরে থাকা চাতুর্য দিয়ে ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছেন যে তিনি যেকোনো দলের জন্যই এক বড় ধরনের হুমকি। অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং নিয়মিত গোলের দেখা পাচ্ছেন। তাদের দুজনের সামনেই সুযোগ রয়েছে একটি বা দুটি ভালো ম্যাচ খেলে শীর্ষ দুই তারকাকে ছুঁয়ে ফেলার।
এই তালিকার পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম স্থানে রয়েছেন আরও তিনজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়, যাদের প্রত্যেকের গোলসংখ্যা ৪টি করে। তারা হলেন ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে, স্পেনের মিকেল ওইয়ারসাবাল এবং ব্রাজিলের তরুণ তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। উসমান দেম্বেলে তার গতি ও স্কিল দিয়ে ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে আরও ধারালো করেছেন। স্পেনের ওইয়ারসাবাল দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আর ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র তার সাম্বা জাদুতে দর্শকদের মুগ্ধ করার পাশাপাশি দলের হয়ে নিয়মিত গোলও আদায় করে নিচ্ছেন। এই তিন খেলোয়াড়ও যেকোনো সময় গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে বড় ধরনের চমক দেখাতে পারেন।
বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের এই লড়াই শুধু খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত অর্জনই নয়, এটি তাদের স্পনসরশিপ ও বাজারমূল্যের ওপরও বিশাল প্রভাব ফেলে। একজন খেলোয়াড় যখন গোল্ডেন বুট জেতেন, তখন তার ব্র্যান্ড ভ্যালু বা বাজারমূল্য এক ধাক্কায় অন্তত ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত বেড়ে যায়। বড় বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো তখন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) খরচ করে তাদের সাথে চুক্তি করার জন্য লাইন ধরে। তাই এই পুরস্কারটি জেতার জন্য খেলোয়াড়দের মধ্যে এক নীরব কিন্তু তীব্র মানসিক লড়াই কাজ করে।
বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তরাও এই গোল্ডেন বুটের লড়াই নিয়ে বেশ মেতে আছেন। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই এখন এমবাপ্পে, মেসি নাকি হলান্ড, কে জিতবেন গোল্ডেন বুট, তা নিয়ে তুমুল তর্কবিতর্ক চলছে। টুর্নামেন্ট এখনো শেষ হয়নি, সামনে আরও রোমাঞ্চকর সব নকআউট ম্যাচ বাকি আছে। তাই শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে এই স্বপ্নের গোল্ডেন বুট, তা জানতে হলে দর্শকদের অবশ্যই ফাইনাল ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।













