চট্টগ্রামে প্রকৃতির তাণ্ডব: এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত, বিপাকে হাজারো পরীক্ষার্থী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

শুরুতেই বড় খবর। চট্টগ্রামের আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে তো নামছেই। টানা কয়েকদিনের অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামসহ আশপাশের জেলাগুলো এখন পানির নিচে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আগামীকাল শনিবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডসহ মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ওই অঞ্চলের সব পরীক্ষা আপাতত বন্ধ থাকবে বলে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বন্যা নিয়ে উদ্বেগ কমেনি।

আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আখতারুজ্জামান আজ শুক্রবার এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন। বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন জেলাগুলোর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা যথারীতি নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ ঢাকা, রাজশাহী বা খুলনা বোর্ডের কোনো পরীক্ষার্থীকে এই দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে না। মূলত চট্টগ্রামের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ায় এই জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার চাচ্ছে না একজন শিক্ষার্থীও এই দুর্যোগের কারণে বিপদে পড়ুক।

আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েকদিনে চট্টগ্রামে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে তা গত ৪৩ বছরের রেকর্ড এক নিমেষেই ভেঙে দিয়েছে। গত ৫ জুলাই থেকে আজ শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শতাংশের হিসেবে এই অঞ্চলের প্রায় ৮০% এলাকা এখন পানির নিচে তলিয়ে আছে। বৃষ্টির এই ভয়াবহতা কেবল জনজীবনকেই বিপর্যস্ত করেনি, বরং কেড়ে নিয়েছে ২৯টি তাজা প্রাণ। পাহাড়ধসে এত মানুষের মৃত্যু পুরো দেশে শোকের ছায়া ফেলেছে। বিশেষ করে পাহাড়ি জেলাগুলোতে মাটির ধস এতটাই প্রবল ছিল যে, শত শত ঘরবাড়ি মাটির নিচে চাপা পড়েছে। এমন শোকাবহ ও বিপজ্জনক পরিবেশে পরীক্ষা নেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত ছিল না।

স্থগিত হওয়া এই তালিকার মধ্যে রয়েছে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি, মাদ্রাসা বোর্ডের আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি (বিএমটি) পরীক্ষা। চট্টগ্রাম বোর্ডের আওতায় থাকা পাঁচটি জেলা—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির সকল পরীক্ষার্থী এই আদেশের আওতায় থাকবে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, অনেক জায়গায় পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতেই এখন বুক সমান পানি। বেঞ্চ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, ওই এলাকার প্রায় ৬০% শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এখন বন্যাদুর্গতদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সেখানে পরীক্ষা নেওয়ার মতো কোনো পরিবেশ অবশিষ্ট নেই।

চট্টগ্রামের বর্তমান এই অবস্থাকে বিশেষজ্ঞরা ‘মহাবিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। কৃষি, মৎস্য ও অবকাঠামো খাতে ক্ষতির পরিমাণ নেহাত কম নয়। প্রাথমিক হিসেবে এই বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ডলারে রূপান্তর করলে প্রায় $৫০ মিলিয়ন বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত হওয়ায় কিছু কিছু দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ১০০% বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিশেষ করে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি পথগুলো এখন চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমন অবস্থায় কোনো পরীক্ষার্থীকে ঘর থেকে বের হতে বলা মানে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই স্থগিতের সিদ্ধান্তটি সঠিক সময়েই এসেছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থগিত হওয়া এই পরীক্ষাগুলোর নতুন সময়সূচি খুব দ্রুতই অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে নতুন করে মানসিক চাপে না ভোগে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে শিক্ষকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো বড় ঝুঁকি নিতে চান না। তবে চট্টগ্রামের বাইরের জেলাগুলোতে আবহাওয়া তুলনামূলক ভালো থাকায় সেখানে পরীক্ষা পেছানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। অন্যান্য বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের তাদের আগের রুটিন ও প্রস্তুতি অনুযায়ীই কেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। গুজব এড়িয়ে কেবল সরকারি বিজ্ঞপ্তির ওপর বিশ্বাস রাখতে শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ক্রান্তিকালে মানবিক সাহায্যেরও বড় প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বন্যায় আটকে পড়া মানুষগুলো এখন খাদ্য ও সুপেয় পানির তীব্র সংকটে ভুগছেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিজিবির পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করা পরিবারগুলোকে ১০০% নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে পরবর্তী সময়ে বিশেষ ক্লাস বা শর্ট সিলেবাসের মতো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে ভাবছেন শিক্ষাবিদরা। তবে বর্তমানে জীবন বাঁচানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রামের এই রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টি ও বন্যা আমাদের আবারও প্রকৃতির রুদ্ররূপের কথা মনে করিয়ে দিল। ৪৩ বছর আগের রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের কতটা সংকটের মুখে ফেলেছে। এখন কেবল স্থগিত হওয়া পরীক্ষার নতুন তারিখের অপেক্ষা। একইসাথে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট মেরামতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। আশা করা হচ্ছে, বৃষ্টি থামলে এবং পানি নেমে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং শিক্ষার্থীরা আবার নিরাপদ পরিবেশে তাদের কাঙ্ক্ষিত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পুরো জাতিকে এখন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ