ঝিনাইদহের শৈলকুপায় এক উৎসবমুখর পরিবেশে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের সূচনা ও সরকারি অনুদান বিতরণ করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এলাকার অসহায় ও দুস্থ মানুষের মুখে হাসি ফোটান। শৈলকুপার সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলের অঙ্গীকার নিয়ে মন্ত্রী এদিন বিভিন্ন দপ্তরের উপকারভোগীদের মাঝে সরকারি সহায়তা হস্তান্তর করেন। এই অনুষ্ঠানটি কেবল একটি সরকারি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং এটি ছিল পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বাবলম্বী হওয়ার এক নতুন সুযোগ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মন্ত্রী স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এলাকার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর তিনি নিজ হাতে উপকারভোগীদের মাঝে নগদ টাকার চেক, বাইসাইকেল, সেলাই মেশিন, ফুটবল এবং স্কুলগামী শিশুদের জন্য ব্যাগ বিতরণ করেন। স্থানীয়দের মধ্যে প্রায় ১৫% বিধবা ও দুস্থ নারীকে সেলাই মেশিন প্রদান করা হয় যাতে তারা ঘরে বসে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। এছাড়াও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া বাইসাইকেলগুলো তাদের স্কুলে যাতায়াতের পথকে আরও সহজ করে দেবে। মন্ত্রী জানান, এলাকার দারিদ্র্য বিমোচনে সরকার প্রায় ৮০% লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই সহায়তার জন্য সরকার এবার কয়েক লক্ষ ডলার সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছে, যা সরাসরি তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
উপকারভোগীদের মাঝে এই উপহার সামগ্রী বিতরণের আগে আইনমন্ত্রী শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উন্নয়ন নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশ নেন। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের সাথে আলাপকালে তিনি স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে আলোচনা করেন এবং ডাক্তারদের সেবার মানসিকতা বাড়ানোর তাগিদ দেন। মন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, বর্তমানে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ সরকার হাতে নিয়েছে। এর ফলে এলাকার প্রায় ৪ লক্ষ মানুষের উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, “হাসপাতাল বড় হলেই হবে না, আমাদের অন্তত ৯০% রোগীকে যাতে উপজেলাতেই চিকিৎসা দেওয়া যায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে।” এই প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে কড়া নির্দেশ দেন।
শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহফুজুর রহমান এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন এবং জেলা পুলিশ সুপার আশিস বিন হাসান। তারা প্রত্যেকেই মন্ত্রীর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান এবং এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য স্থানীয়দের সহযোগিতা কামনা করেন। পুলিশ সুপার তার বক্তব্যে বলেন যে, এলাকায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না এবং অপরাধ দমনে তারা ১০০% জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব ছিল, এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা অনেকটা কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “আমি শৈলকুপার সন্তান, তাই এই মাটির প্রতি আমার ঋণ অনেক বেশি। আপনাদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা এই অনুদানগুলো যাতে সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছায়, তা দেখার দায়িত্ব আমার।” তিনি আরও জানান যে, এলাকার রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশেষ ফান্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের জন্য সরকার ৫% সুদে ঋণের ব্যবস্থা করছে যাতে তারা ফসল উৎপাদনে কোনো বাধার সম্মুখীন না হয়। মন্ত্রী সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে কাউকে যেন কোনো বাড়তি টাকা গুনতে না হয়। যদি কেউ অনিয়ম করে, তবে আইনমন্ত্রী হিসেবে তিনি নিজেই তার ব্যবস্থা নেবেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মাঝে স্কুল ব্যাগ ও বাইসাইকেল পেয়ে এক ধরনের আনন্দের জোয়ার লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় এক নারী উপকারভোগী জানান, “আগে কখনো সরাসরি মন্ত্রীর হাত থেকে এভাবে কিছু পাব তা ভাবিনি। এই সেলাই মেশিনটা আমার সংসার চালাতে বড় সাহায্য করবে।” মানুষের এমন স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, আসাদুজ্জামান শৈলকুপার মানুষের কাছে কতটা প্রিয় হয়ে উঠেছেন। এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে তিনি যে সকল ঘোষণা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শৈলকুপার চেহারা বদলে যাবে।
মন্ত্রীর এই সফরের আরেকটি বড় উদ্দেশ্য ছিল এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা। সাম্প্রতিক সময়ে শৈলকুপায় বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে যে উত্তেজনার খবর পাওয়া গিয়েছিল, সে বিষয়ে মন্ত্রী স্থানীয় নেতাকর্মীদের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন এলাকায় শান্তি বজায় থাকবে। আমরা সংঘাত চাই না, আমরা সমৃদ্ধি চাই।” তিনি স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন। দিনের শেষ ভাগে তিনি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং সবার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। প্রতিকূল আবহাওয়া থাকলেও দিনভর এই কর্মসূচিগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হয়, যা শৈলকুপার মানুষের জন্য একটি স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে।













