রোনালদোকে খেলানো নিয়ে সমালোচনার জবাব দিলেন পর্তুগাল কোচ, জানালেন বিদায়ের কথাও

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে পর্তুগালের বিদায় নেওয়ার পর থেকেই ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। আর এই সমালোচনার সবচেয়ে বড় তিরটি ছুটে যাচ্ছে পর্তুগালের প্রধান কোচ রবার্তো মার্তিনেজের দিকে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে কেন ম্যাচের পুরো ৯০ মিনিট খেলানো হলো? আগের ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে দুর্দান্ত গোল করা তরুণ স্ট্রাইকার গনসালো রামোসকে কেন এক মিনিটের জন্যও মাঠে নামার সুযোগ দেওয়া হলো না? ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এই সব কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় কোচ মার্তিনেজকে।

তবে চারদিক থেকে ধেয়ে আসা সমালোচনার মুখেও নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তের বিষয়ে একেবারে অটল ছিলেন রবার্তো মার্তিনেজ। তার মতে, পর্তুগালের যখন একটি অতি প্রয়োজনীয় গোল দরকার ছিল, তখন রোনালদোর মতো একজন অভিজ্ঞ ও বিশ্বমানের খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো অর্থই হয় না। তিনি জানান, ম্যাচটি যদি অতিরিক্ত সময়ে গড়াত, তবে হয়তো রামোসকে খেলানোর সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু তার আগেই, দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের মিকেল মেরিনোর করা একমাত্র গোলে পর্তুগালের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন চিরতরে ভেঙে যায়।

পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকলেও রোনালদোর পারফরম্যান্স ছিল বেশ হতাশাজনক। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি মাত্র ২০ বার বল স্পর্শ করতে পেরেছেন। এর মধ্যে স্পেনের ডি-বক্সে তিনি মাত্র তিনবার বল নিয়ে ঢুকতে পেরেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এর কোনোটিই শেষ পর্যন্ত পর্তুগালের জয়ে কাজে লাগেনি। সমালোচকদের মতে, চল্লিশ পেরোনো রোনালদোর খেলায় আগের সেই ক্ষিপ্রতা ও ধার আর অবশিষ্ট নেই। এই বয়সে এসে তাকে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে খেলানোটা দলের জন্য একপ্রকার বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপেও তৎকালীন কোচ ফার্নান্দো সান্তোস রোনালদোকে অনেক ম্যাচে বদলি হিসেবে ব্যবহার করতেন।

কিন্তু এসব যুক্তির সঙ্গে মোটেও একমত নন কোচ মার্তিনেজ। তিনি মনে করেন, পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই মহাতারকাকে মাঠে রাখাই দলের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মার্তিনেজ বলেন, “দল যখন একটি গোলের জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছে, তখন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে কোনোভাবেই তুলে নেওয়া যায় না। সে এখনো পুরো ৯০ মিনিট খেলার মতো ফিট আছে, এতে তার কোনো সমস্যা নেই। মাঠে শুধু তার উপস্থিতিই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে একটা বড় মানসিক চাপ তৈরি করে। সে অন্য খেলোয়াড়দের জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়, সেট পিসে কিংবা বক্সের ভেতরে যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তাই ৯০ মিনিটে তাকে তুলে নেওয়ার কোনো যৌক্তিক অর্থ ছিল না।”

কাতার বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে রোনালদোর জায়গায় খেলতে নেমে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন গনসালো রামোস। ২৫ বছর বয়সী এই ইনফর্ম স্ট্রাইকার এবারের আসরের শেষ বত্রিশে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও বদলি নেমে একটি দারুণ গোল করেছিলেন। তাকে না খেলানোর বিষয়ে পর্তুগাল কোচ তার অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, “অতিরিক্ত সময়ে হয়তো গনসালো রামোসকে ব্যবহার করার সুযোগ আসত। কিন্তু ৯০ মিনিট পর্যন্ত দলের খেলার কাঠামো ঠিক রাখাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখন দলের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।”

ষষ্ঠ বিশ্বকাপে নিজের ২৭তম ম্যাচ খেলতে নামা রোনালদো পুরো ম্যাচেই একপ্রকার নিষ্প্রভ ছিলেন। তবু অধিনায়কের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন মার্তিনেজ। তিনি বলেন, “আমি যখন পর্তুগালের দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন ক্রিস্টিয়ানোকে নিয়ে অনেকের মনে অনেক সংশয় ছিল। কিন্তু সে শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট দিয়েই নয়, দলের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি, নিবেদন আর ফুটবলকে সে যেভাবে ধারণ করে, সব দিক থেকেই সে একজন অনুকরণীয় মানুষ হয়ে উঠেছে। তাকে আমাদের উদ্‌যাপন করা উচিত।”

আল নাসর তারকা রোনালদোকে নিয়ে মার্তিনেজ আরও বলেন, “আমরা ফুটবলের এক আইকন বা কিংবদন্তিকে নিয়ে কথা বলছি। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো খেলোয়াড় ফুটবল বিশ্বে খুব বেশি নেই। এই বিশ্বকাপে সে দলের জন্য যা করেছে, তার জন্য আমাদের সবার তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। খেলোয়াড় হিসেবে, অধিনায়ক হিসেবে এবং একজন ভালো মানুষ হিসেবেও সে আমাদের তরুণদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।”

সংবাদ সম্মেলনের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে স্প্যানিশ এই কোচ একটি বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান যে, পর্তুগাল দলকে চিরতরে বিদায় জানাতে চলেছেন তিনি। মার্তিনেজ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “পর্তুগালে আমি এসেছিলাম বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সেটা যখন হয়নি, তখন আর এই দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। এখানেই আমার শেষ।” তার এই ঘোষণার মাধ্যমে পর্তুগাল ফুটবলে একটি নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ