ফরিদপুর শহরের সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) যেখানে থাকার কথা ছিল সবচাইতে নিরাপদ আশ্রয়, সেখানে ঘটল এক হাড়হিম করা কলঙ্কজনক ঘটনা। সরকারি এই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী এখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পুরো জেলা জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—সরকারের খাস কামরায় যেখানে ১০০% নিরাপত্তা থাকার কথা, সেখানে এমন পৈশাচিক ঘটনা ঘটে কী করে? এই ঘটনায় পুলিশ মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে এবং দায়িত্বে চরম অবহেলার দায়ে ওই প্রতিষ্ঠানের ৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনার শুরু থেকে কর্তৃপক্ষ সব কিছু চেপে রাখার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি।
ভুক্তভোগী এই কিশোরী কিছুটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এবং সে ফরিদপুর শহরের একটি স্থানীয় বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। মা-বাবা হারা মেয়েটির আশ্রয় হয়েছিল সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই শিশু পরিবারে। কিন্তু সেই আশ্রয়েই তার জীবনে নেমে এল ঘোর অন্ধকার। মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ৫৪ বছর বয়সী দর্জি মো. ওয়াহিদ শেখ এই পাশবিক কাজের মূল নায়ক। গত ৫ জানুয়ারি ওই কিশোরী যখন স্কুল থেকে ফিরছিল, তখন ওয়াহিদ শেখ তাকে চকোলেটের প্রলোভন দেখিয়ে ফুসলিয়ে নিজের দোকানে নিয়ে যান এবং প্রথমবার ধর্ষণ করেন। এরপর আরও কয়েকবার বিভিন্ন অজুহাতে মেয়েটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। কিশোরীটি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ার সুযোগ নিয়ে অভিযুক্ত এই লোক দিনের পর দিন তার ওপর অত্যাচার চালিয়ে গেছেন।
দীর্ঘ ছয় মাস ধরে মেয়েটির শরীরে নানা পরিবর্তন এলেও শিশু পরিবারের কর্মকর্তাদের চোখে তা ধরা পড়েনি। গত ৬ জুলাই যখন কিশোরীর শারীরিক জটিলতা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। তারা তড়িঘড়ি করে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায় সে ২৪ সপ্তাহের অর্থাৎ প্রায় ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই খবর পাওয়ার পরপরই সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেন। পুলিশ গত বুধবার অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ওয়াহিদ শেখকে গ্রেপ্তার করে। কোতোয়ালি থানার ওসি মাহমুদুল হাসান জানান, আসামিকে আদালতের মাধ্যমে সরাসরি জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনায় খোদ সরকারি দপ্তরের ভেতরে থাকা নিরাপত্তার অভাবগুলো নগ্নভাবে সামনে চলে এসেছে। সরকার প্রতি বছর এই শিশু পরিবারের উন্নয়ন ও মেয়েদের খাবারের জন্য কয়েক হাজার ডলার ($) সমপরিমাণ টাকা খরচ করে। কিন্তু যে মানুষগুলোর ওপর এই মেয়েদের পাহারার দায়িত্ব ছিল, তারা কী করছিলেন? সেই প্রশ্ন তুলে সমাজসেবা অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ৫ জন কর্মীকে বরখাস্ত করেছে। বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান, মেট্রন মনি আক্তার এবং আয়া শামসুন্নাহারসহ আরও কয়েকজন। কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে, যদি দায়িত্বরত ব্যক্তিরা অন্তত ১০% ও সচেতন হতেন, তবে এমন একটি মাসুম বাচ্চার জীবন এভাবে নষ্ট হতো না।
ফরিদপুরের এই শিশু পরিবারটির ইতিহাস প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। এই দীর্ঘ সময়ে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা আর কখনো ঘটেনি বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। সাবেক এক কর্মকর্তার মতে, আগে এখানে সীমানা প্রাচীর ছিল না, তখন কিছু বাইরের লোক উত্যক্ত করত। কিন্তু এখন সব সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেন নজরদারি নেই? দেখা গেছে, যে সময়টাতে মেয়েটি স্কুলে যাতায়াত করত, সেই সময়টাতে তাকে চোখে চোখে রাখার কোনো বিশেষ ব্যবস্থা ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক এই চরম উদাসীনতা এখন কিশোরীটির ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, কেবল সাময়িক বরখাস্ত করলেই হবে না, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মেয়ের সাথে এমনটা না ঘটে।
বর্তমানে ভুক্তভোগী ওই কিশোরীকে আদালতের বিশেষ নির্দেশে ‘নারী ও শিশু কিশোরী মহিলা হেফজতিদের আবাসন কেন্দ্র’-এ রাখা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসকরা তার স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর রাখছেন। তবে একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুর জন্য এই মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এই ঘটনার পর সরকারি শিশু পরিবারের অন্য মেয়েদের মধ্যেও এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এহিয়াতুজ্জামান জানিয়েছেন, তারা এখন প্রতিটি নিবাসীকে আলাদাভাবে কাউন্সিলিং করছেন এবং নিরাপত্তার বিষয়টি ১০০% নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ানোসহ যাতায়াতের সময় বিশেষ প্রহরার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই নেক্কারজনক ঘটনা আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিককে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। যেখানে একটি শিশুর অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্র নিজেই দাঁড়িয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রের কর্মচারীদের গাফিলতিতে একটি শিশুর জীবন বিষিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অভিযুক্ত দর্জি ওয়াহিদ শেখের পাশাপাশি অবহেলাকারী কর্মকর্তাদেরও ফৌজদারি দণ্ড দেওয়া উচিত। টাকার বিনিময়ে বা প্রভাব খাঁটিয়ে যাতে এই মামলা কেউ দুর্বল করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। ফরিদপুরবাসী এখন বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, যাতে এই অবুঝ মেয়েটি অন্তত ন্যায়বিচার পায়।
শৈশব থেকে যে মেয়েটি তার সবচাইতে কাছের মানুষদের হারিয়েছে, তার জন্য এই পৃথিবীটা যেন এক কঠিন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আমাদের সমাজ ও প্রশাসন যদি এখনই সচেতন না হয়, তবে এরকম আরও অনেক ঘটনা পর্দার আড়ালে থেকে যাবে। ফরিদপুরের এই ঘটনাটি কেবল একটি ধর্ষণ মামলা নয়, এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার দলিল। আশা করা হচ্ছে, আইন বিভাগ দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলা নিষ্পত্তি করবে এবং অপরাধীকে তার প্রাপ্য সাজা দেবে। একই সাথে সমাজের সচেতন মানুষদের উচিত এমন বিপদে পড়া শিশুদের পাশে দাঁড়ানো এবং এই ধরনের কুলাঙ্গারদের সামাজিকভাবে বয়কট করা।













