সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত ও উত্তেজনাকর ঘটনা হলো ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং তাঁর জানাজা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তিনি নিহত হন। এরপর বেশ কয়েকমাস পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাঁর জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। অবশেষে জুলাই মাসের শুরুতে তেহরানে যখন তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হলো, তখন সেটি কেবল একটি ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই জানাজার দৃশ্য, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং বিশ্বনেতাদের মন্তব্যগুলো যেন একটি জ্বলন্ত সত্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। আর সেই সত্যটি হলো আমাদের এই পৃথিবী এখন আর এক নেই, এটি পুরোপুরি দুটি ভিন্ন মেরুতে ভাগ হয়ে গেছে। খামেনির জানাজা যেন সেই বিভক্ত পৃথিবীর একটি সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
তেহরানের রাজপথে জনতার ঢল
খামেনির জানাজায় তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে শুরু করে পুরো শহরের রাজপথে লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল। কালো পোশাক পরা শোকাহত মানুষ, তাদের হাতে থাকা প্রতিশোধের লাল পতাকা এবং কান্নার আওয়াজ প্রমাণ করে যে, ইরানের অভ্যন্তরে তাঁর বিশাল জনসমর্থন রয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে আসছিল যে, ইরানের সাধারণ মানুষ সরকারের ওপর চরম বিরক্ত এবং সুযোগ পেলেই তারা বিদ্রোহ করবে। কিন্তু খামেনির জানাজায় উপস্থিত মানুষের এই বিশাল সমুদ্র সেই ধারণাকে অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। লাখো মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, দেশের ভেতরে একটি বড় অংশ এখনো তাদের নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আনুগত্য পোষণ করে এবং তারা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একতাবদ্ধ।
পশ্চিমা বিশ্ব ও প্রাচ্যের বিপরীতমুখী অবস্থান
খামেনির মৃত্যু এবং জানাজাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্ব এবং প্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে এক বিশাল পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা খামেনিকে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার মূল কারণ হিসেবে দেখত। তাঁর মৃত্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোতে এক ধরনের স্বস্তি এবং কোথাও কোথাও নীরব উল্লাস দেখা গেছে। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন এবং গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ ইরানকে পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে। তারা খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে এবং এই হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছে। এই বিপরীতমুখী অবস্থান প্রমাণ করে যে বিশ্ব রাজনীতি এখন স্পষ্টত দুটি শিবিরে বিভক্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে স্পষ্ট মেরুকরণ
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বরাবরই জটিল, তবে খামেনির জানাজা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও স্পষ্ট করেছে। ইরানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘অ্যাক্সিস অব রেসিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয়ের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া বাহিনী খামেনির মৃত্যুতে গভীর শোক পালন করেছে। তারা এই জানাজাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিশোধের শপথ নিয়েছে। বিপরীতে, মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিমা মিত্র আরব দেশগুলো এই ইস্যুতে অনেকটাই নীরবতা পালন করেছে। কেউ কেউ আবার গোপনে স্বস্তি প্রকাশ করেছে। একই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে এই আকাশ-পাতাল পার্থক্য প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্য এখন দুটি ভিন্ন আদর্শের যুদ্ধে লিপ্ত।
সামরিক সংঘাত ও পরাশক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া
খামেনির ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না; এটি ছিল সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা। খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া লাখো মানুষ সমস্বরে যখন ‘যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস হোক’ স্লোগান দিচ্ছিল, তখন বোঝা যাচ্ছিল যে এই সংঘাত সহজে থামার নয়। পরাশক্তিগুলোও এই জানাজার সময় নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। খামেনির জানাজার কারণে শান্তি আলোচনা সাময়িক স্থগিত রাখার খবরও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছে। রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো যখন ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে, তখন আমেরিকা ইসরায়েলের নিরাপত্তায় নিজেদের সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করেছে। পরাশক্তিগুলোর এই মুখোমুখি অবস্থান প্রমাণ করে যে স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ার এখন আর ইতিহাসের পাতায় নেই, বরং তা নতুন রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে তীব্র বিভক্তি
শুধু সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যেই নয়, খামেনির জানাজা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে থাকা বিভক্তিকেও সামনে এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে চোখ রাখলেই এই চিত্র পরিষ্কার বোঝা যায়। একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ মানুষ এবং প্রবাসী ইরানিদের একটি অংশ খামেনির মৃত্যুকে উদযাপন করেছে। অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ, বিশেষ করে যারা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরোধী, তারা খামেনিকে একজন বীর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। একদল মানুষ যাকে স্বৈরশাসক বলছে, আরেকদল মানুষ তাকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক মানছে। সাধারণ মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন আগে কখনো এতটা প্রকটভাবে দেখা যায়নি।
নেতৃত্বের পালাবদল এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু হামলায় আহত হওয়ায় তাকে এখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। খামেনির তিন ছেলে মাসুদ, মাইসাম ও মোস্তফা জানাজায় উপস্থিত থাকলেও নতুন নেতার অনুপস্থিতি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই নেতৃত্বের পালাবদল এবং জানাজার বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইরান বিশ্বকে একটি বার্তা দিয়েছে যে, তারা কোনোভাবেই মাথা নত করবে না। তবে এই অনড় অবস্থানের কারণে ভবিষ্যৎ বিশ্ব পরিস্থিতি যে আরও অনিশ্চিত ও সংঘাতময় হয়ে উঠছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পৃথিবী এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যেকোনো মুহূর্তে একটি বৃহত্তর যুদ্ধ বেধে যাওয়ার শঙ্কা কাজ করছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা শুধু একজন নেতার শেষ বিদায় অনুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক, সামরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনের একটি নিখুঁত আয়না। এই জানাজা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, বিশ্ব আজ আর কোনো একক পরাশক্তির কথায় চলে না। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের একমুখী শাসনকে চ্যালেঞ্জ করার মতো একটি শক্তিশালী মেরু তৈরি হয়ে গেছে। যে পৃথিবী এতদিন এক সুতোয় বাঁধা ছিল বলে আমরা বিশ্বাস করতাম, খামেনির জানাজা প্রমাণ করল সেই পৃথিবী এখন স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত। এই বিভক্তি আগামী দিনে বিশ্বকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত শান্তি যে অনেক দূরের পথ, তা খুব সহজেই অনুমেয়।














