কোম্পানীগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান: ৩ জনের জেল ও জরিমানা, প্রশাসনের কঠোর বার্তা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় মাদকের অভিশাপ রুখতে প্রশাসন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত শনিবার, ১১ জুলাই একটি বিশেষ টাস্কফোর্স অভিযান চালানো হয়। দিনভর পরিচালিত এই অভিযানে মাদক কেনাবেচা এবং সেবনের অকাট্য প্রমাণ পাওয়ায় তিনজনকে হাতেনাতে ধরে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মাদকবিরোধী এই বিশেষ অভিযানে নেতৃত্ব দেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুবাইয়া বিনতে কাশেম। প্রশাসনের এই অতর্কিত হামলায় মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় সাধারণ মানুষ এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

অভিযানটি মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পরিচালিত হয়েছে। প্রথমত, সিরাজপুর ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রাম এবং দ্বিতীয়ত, ব্যস্ততম বসুরহাট বাসস্ট্যান্ড এলাকা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (DNC) এবং পুলিশের একটি চৌকস দল এই টাস্কফোর্সে অংশ নেয়। অভিযান চলাকালে দেখা যায়, কিছু মাদকসেবী ও বিক্রেতা প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করছে। তবে পুলিশ ও ডিনসি সদস্যরা চারদিক থেকে এলাকাটি ঘিরে ফেলায় তারা সফল হতে পারেনি। গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত এই অভিযানে ১০০% লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, মাদক নির্মূলে এ ধরনের ঝটিকা অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনাস্থলেই সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে সাজা ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রথমজন হলেন ৫০ বছর বয়সী জামাল উদ্দিন। তিনি বসুরহাট পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের রামদি এলাকার বাসিন্দা এবং মৃত আবুল কালামের ছেলে। তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা নগদ অর্থদণ্ড করা হয়েছে। দ্বিতীয় জন হলেন সিরাজপুর ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রামের অরুন চন্দ্র দাস (৪৭), যাকে ৩ দিনের জেল ও ২০০/- টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ফখরুল হোসেন নামের অন্য এক ব্যক্তিকে ৭ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০/- টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, এদের প্রত্যেকেই মাদক সেবন বা কেনাবেচার মাধ্যমে এলাকার জনশৃঙ্খলা নষ্ট করছিলেন।

মাদক কেবল একজন ব্যক্তির শারীরিক ক্ষতি করে না, এটি একটি পুরো পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। পরিসংখ্যান বলছে, মাদকাসক্তির কারণে পারিবারিক সহিংসতা এবং সামাজিক অপরাধের হার প্রায় ৫০% বৃদ্ধি পায়। কোম্পানীগঞ্জের এই অভিযানে ম্যাজিস্ট্রেট যে তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন, তা মূলত অপরাধীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দাবি, এ ধরনের অভিযানের ফলে এলাকায় অপরাধের প্রবণতা অন্তত ২০% থেকে ৩০% কমে আসবে। সাজাপ্রাপ্তদের দ্রুত জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং জরিমানার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুব্রত সরকার শুভ এই অভিযানের বিষয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের এই যুদ্ধ এক দিনের জন্য নয়। আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি।” তিনি আরও জানান যে, বর্তমানে নোয়াখালী জেলায় মাদকের সরবরাহ লাইন ১০০% বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তার বিভাগ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি সদস্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন যাতে তরুণ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। মাদক নির্মূলে কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং সামাজিক সচেতনতাও জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বসুরহাট এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যার পর বাসস্ট্যান্ড বা নির্জন এলাকাগুলোতে মাদকসেবীদের আনাগোনা সাধারণ মানুষের চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটাত। স্থানীয় একজন দোকানি জানান, “বিজিবি বা পুলিশ যখন এভাবে অ্যাকশন নেয়, তখন আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীরা শান্তিতে থাকতে পারি। আমরা চাই এ ধরনের টাস্কফোর্স অভিযান মাসে অন্তত ৪-৫ বার চালানো হোক।” স্থানীয়দের দাবি, বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে পারলে এই সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান হবে। প্রশাসনও আশ্বাস দিয়েছে যে, ছোট খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি পাইকারি মাদক ব্যবসায়ীদেরও আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ চলছে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুবাইয়া বিনতে কাশেমের এই সাহসী ভূমিকা এলাকায় বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, জনস্বার্থে এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিয়মিত নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় দেখা হবে না, অপরাধ করলেই তাকে সাজা পেতে হবে। অভিযানে জব্দকৃত মাদকদ্রব্যগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জের এই সাফল্য নোয়াখালীর অন্যান্য উপজেলার জন্য একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, মাদকের বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জ প্রশাসনের এই জয় এক বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ১১ জুলাইয়ের এই অভিযানে ৩ জনকে সাজা দেওয়ার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, অপরাধ করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রশাসন, পুলিশ এবং সাধারণ মানুষ যদি একসাথে কাজ করে, তবে খুব দ্রুতই ১০% এর নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে মাদক সংক্রান্ত অপরাধের হার। আগামীর সুন্দর ও সুস্থ প্রজন্মের জন্য কোম্পানীগঞ্জকে একটি নিরাপদ আবাসে পরিণত করার লক্ষ্যেই এই সংগ্রাম চলবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ