মেরিনো জাদুতে ১৬ বছর পর সেমিফাইনালে স্পেন: বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের করুণ বিদায়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ফুটবল বিধাতা বোধহয় মিকেল মেরিনোর জন্য আলাদা কোনো চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে যেখানে তিনি শেষ করেছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই যেন বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইটা শুরু করলেন এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। সেই ম্যাচেও তিনি বদলি হিসেবে নেমে শেষ মুহূর্তে গোল করে দলকে বাঁচিয়েছিলেন, আর আজ লস অ্যাঞ্জেলেসের মেমোরিয়াল কোলোসিয়াম স্টেডিয়ামেও সেই একই দৃশ্য। ৮৮ মিনিটে মেরিনোর সেই অসামান্য গোলটি কেবল স্পেনকে ২-১ ব্যবধানে জয়ই এনে দেয়নি, বরং দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশটিকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের টিকিটও এনে দিয়েছে। গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার স্প্যানিশ সমর্থকের গগনবিদারী চিৎকার তখন জানিয়ে দিচ্ছিল, স্পেনের ফুটবলে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল আর আক্রমণের ধার সব দিকেই স্পেনের ফুটবলারদের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। ম্যাচের প্রায় ৬০% সময় বল ছিল স্পেনের ফুটবলারদের পায়ে। স্পেনের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এতটাই নিখুঁত ছিল যে বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইনাদের প্রথমার্ধের অনেকটা সময় রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। ম্যাচের ৩০ মিনিটে স্পেনের সেই দাপুটে ফুটবল পূর্ণতা পায়। দানি ওলমোর একটি দুর্দান্ত আক্রমণ বেলজিয়ামের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া কোনোমতে ঠেকিয়ে দিলেও বিপদ কাটেনি। ফিরতি বলে চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় শট নিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন ফাবিয়ান রুইজ। স্পেনের খেলোয়াড়দের সেই বুনো উদ্‌যাপন তখন মাঠের পরিবেশকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

তবে বেলজিয়ামও যে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়, তারা সেটা প্রমাণ করল ৪১ মিনিটেই। স্পেনের রক্ষণভাগ এই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা ৬০০ মিনিটের বেশি সময় কোনো গোল হজম করেনি, যা একটি অনন্য রেকর্ড। কিন্তু সেই অজেয় রক্ষণও শেষ পর্যন্ত ভাঙল চার্লস ডি কেটেলারারের অসাধারণ এক হেডে। টিমোথি কাস্তানিয়ের মাপা এক ক্রস থেকে ডি কেটেলারার যখন জালে বল জড়ালেন, তখন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমনের চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। সমতা ফেরার পর ম্যাচটি যেন আরও বেশি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। দুই দলই সুযোগ সন্ধানী ফুটবল খেলতে শুরু করে, কিন্তু প্রথমার্ধ ১-১ গোলেই শেষ হয়।

ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় দ্বিতীয় হাফের ৭২ মিনিটে। বেলজিয়ামের দুর্গ আগলে রাখা থিবো কোর্তোয়া হঠাৎই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই গোলরক্ষকের বিদায়ে বেলজিয়ামের রক্ষণ যেন হঠাৎ করেই কিছুটা এলোমেলো হয়ে পড়ে। কোর্তোয়ার বদলে মাঠে নামেন তরুণ গোলরক্ষক সেনে লামেন্স। আর এই পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ামের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। অভিজ্ঞ কোর্তোয়া থাকলে হয়তো ৮৮ মিনিটের সেই আক্রমণটি ঠেকিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু লামেন্সের একটি ছোট পজিশনিং ভুলের সুযোগ নিয়ে মিকেল মেরিনো বলটি জালে জড়াতে ভুল করেননি। আর্সেনালের হয়ে ক্লাব ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করার অভ্যাসটি তিনি জাতীয় দলের জার্সিতেও শতভাগ (১০০%) বজায় রাখলেন।

এই হারের মাধ্যমে ফুটবলের এক মহাকাব্যের করুণ সমাপ্তি ঘটল। বেলজিয়ামের সেই বিখ্যাত ‘সোনালি প্রজন্মের’ শেষ তিন প্রতিনিধি রোমেলু লুকাকু, থিবো কোর্তোয়া এবং কেভিন ডি ব্রুইনার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের সময় লুকাকুর বয়স হবে ৩৭, কোর্তোয়ার ৩৮ এবং ডি ব্রুইনার ৩৯ বছর। বাস্তবতার নিরিখে এটাই ছিল তাদের শেষ সুযোগ। ফুটবলের র‍্যাঙ্কিংয়ে দীর্ঘ সময় ১ নম্বরে থাকলেও কোনো বড় ট্রফি না জেতার আক্ষেপ নিয়েই হয়তো তাদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করতে হবে। বেলজিয়ামের সমর্থকদের জন্য এটি কেবল একটি হার নয়, বরং একটি যুগের অবসান।

অন্যদিকে, স্পেনের এই জয় তাদের সেমিফাইনালে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে শক্তিশালী ফ্রান্সের মুখোমুখি। আগামী মঙ্গলবার রাতে ডালাসের মাঠে হতে যাওয়া সেই লড়াইকে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা ‘আগাম ফাইনাল’ হিসেবেই দেখছেন। ফিফা এবং উয়েফার তথ্য অনুযায়ী, এই দুটি দলের স্কোয়াড ভ্যালু বা বাজারমূল্য বর্তমানে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ($1B) ছাড়িয়ে গেছে। ফ্রান্সের আক্রমণভাগ বর্তমানে বিশ্বের সেরা আক্রমণভাগগুলোর একটি। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে এবং ওলিসে যদি তাদের শতভাগ (১০০%) ফর্মে থাকেন, তবে যেকোনো দলের পক্ষেই তাদের আটকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। তবে স্পেনের রক্ষণভাগ যেভাবে এই টুর্নামেন্টে পারফর্ম করেছে, তাতে লড়াইটি হবে সমানে সমান।

স্পেনের এই রূপকথার মতো পথচলার পেছনে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন তাদের কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তে। তিনি দলে তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার এক চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করেছেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের এই জয়ে স্পেন কেবল সেমিতেই ওঠেনি, বরং তারা নিশ্চিত করেছে বড় অংকের প্রাইজমানিও। ধারণা করা হচ্ছে, সেমিফাইনালে ওঠার দরুন স্পেন ফুটবল ফেডারেশন প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার ($25M) বোনাস পেতে যাচ্ছে। তবে টাকার চেয়েও স্প্যানিশদের কাছে বড় হলো সেই সোনালি ট্রফিটি, যা তারা সবশেষ জিতেছিল ২০১০ সালে। সেই শিরোপা খরা কাটানোর আর মাত্র দুটি ধাপ বাকি।

ডালাসে ফ্রান্স বনাম স্পেনের সেই মহরণ দেখার জন্য পুরো বিশ্ব এখন মুখিয়ে আছে। একপাশে এমবাপ্পের গতি আর অন্যদিকে স্পেনের টিকিটাকা ফুটবলের নতুন সংস্করণ ফুটবল প্রেমীদের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে! মঙ্গলবার রাতের সেই ম্যাচে কে হাসবে শেষ হাসি, তা বলা কঠিন। তবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে আজকের এই জয় স্পেনের আত্মবিশ্বাসকে যে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। মিকেল মেরিনো কি পারবেন সেমিফাইনালেও তার গোল করার এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে? উত্তরটা সময়ের হাতে তোলা থাকল।

সম্পর্কিত নিবন্ধ