দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল এবার হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস বইবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি দিয়ে ইরানে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। গত বুধবার রাতের এই হামলায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ইরানের অন্তত ১১টি এলাকা। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা ইরানের সামরিক শক্তি গুঁড়িয়ে দিতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। পাল্টা জবাবে তারা কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এখন পুরো বিশ্ব তটস্থ, বিশেষ করে বিশ্ব তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল গত মঙ্গলবার রাতে, যখন পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, ইরানই এই হামলার পেছনে দায়ী এবং সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে তারা বুধবার রাতে ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে জোরালো অভিযান শুরু করে। যদিও তেহরান শুরু থেকেই জাহাজে হামলার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। বুধবারের হামলায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম আকাশপথ ব্যবহার করে ইরানের প্রায় ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে আছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন তৈরির কারখানা এবং নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। এক রাতের ব্যবধানে ১১টি শহরে হামলা চালানোর ঘটনাটি ইরানকে বড় ধরনের সামরিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার পর সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা না দিলেও তার সুর ছিল বেশ চড়া। তিনি তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ইরানের সাথে করা যুদ্ধবিরতির দিন শেষ হয়েছে। ট্রাম্প পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের উসকানিমূলক আচরণের জবাব দিতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তার হুঁশিয়ারি, ইরান যদি আবারও কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আরও কড়া ও বিধ্বংসী জবাবের জন্য তাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। মার্কিন প্রশাসনের এমন আগ্রাসী অবস্থান দেখে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সমঝোতা স্মারকটি এখন কেবল একটি কাগজ ছাড়া আর কিছুই নয়। শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ইরানের পক্ষ থেকেও এসেছে পাল্টা চপেটাঘাতের হুমকি। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, সমঝোতা স্মারকের শর্ত ভেঙে যুক্তরাষ্ট্র যে অন্যায় করেছে, তার মূল্য তাদের হাড়েমাসু গুনতে হবে। তিনি হুংকার দিয়ে বলেন, “আঘাত হানলে পাল্টা আঘাতের জন্য তৈরি থাকো।” ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এরই মধ্যে তাদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন শুরু করেছে। তারা বুধবার রাতেই বাহরাইনের জুফাইর ও শেখ ইসা ঘাঁটি এবং কুয়েতের আরিফজান সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এমনকি কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক স্যাটেলাইট সিস্টেমও ইরানের নিশানায় পড়েছে। কুয়েত সরকার জানিয়েছে, ইরানের হামলায় তাদের দেশে অন্তত ১ জন আহত হয়েছেন।
যুদ্ধে কেবল সামরিক স্থাপনা নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবন ও বেসামরিক সম্পদও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গল ও বুধবার—এই দুই দিনের মার্কিন হামলায় ইরানে মোট ১৪ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। চাবাহার শহরে একটি হাসপাতালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আকাশপথে চালানো এই হামলায় ইরানশাহর বিমানবন্দরের অবকাঠামো তছনছ হয়ে গেছে। আকালা শহরে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলসেতু ধ্বংস করা হয়েছে এবং তেহরান থেকে মাশহাদগামী রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বেসামরিক এসব স্থাপনায় হামলা চালানোয় আন্তর্জাতিক মহলেও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
এই নতুন উত্তেজনা কেবল সামরিক ময়দানেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। গত বুধবারের হামলার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম রাতারাতি ১% (এক শতাংশ) বেড়ে গেছে। যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে জ্বালানি তেলের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন বিশ্বনেতারা। এদিকে নিজ দেশেও চাপের মুখে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন মাত্র ৩৪% শতাংশে নেমে এসেছে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন, আর তার আগে তেলের দাম বাড়লে বা নতুন করে কোনো যুদ্ধে জড়ালে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আরও তলানিতে ঠেকতে পারে।
মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টিও ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বিরোধিতা করছে। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মার্কিন কংগ্রেস এই যুদ্ধের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল। তাই কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ট্রাম্পের এভাবে হামলা চালানো আইনত ঠিক হচ্ছে না। তবে বিশ্লেষক জোনাথন প্যানিকফ মনে করেন, ইরানের প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর দুই দেশ হয়তো আবারও আলোচনার টেবিলে বসতে পারে। এখনকার এই হামলাগুলো মূলত একে অপরকে আলোচনার টেবিলে চাপে রাখার কৌশল হতে পারে। তবে পরিস্থিতি যে কোনো সময় হাতের বাইরে চলে গিয়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নিতে পারে, সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এখন দেখার বিষয়, মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই চিরশত্রু দেশ কি শেষ পর্যন্ত ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পথে হাঁটবে, নাকি পর্দার আড়ালের কূটনীতি পরিস্থিতি শান্ত করতে সক্ষম হবে। তবে আপাতত শান্তির চেয়ে বারুদের গন্ধই বেশি ভারী হয়ে উঠেছে পারস্য উপসাগরের আকাশে।













