বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে মাঝে মাঝেই এমন কিছু ম্যাচের জন্ম হয়, যা দর্শকদের আজীবন মনে থাকে। মায়ামি স্টেডিয়ামে আজ ঠিক তেমনই এক মহাকাব্যিক লড়াই দেখল পুরো ফুটবল বিশ্ব। ১২০ মিনিট ধরে চলা এই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের গল্প যেখান থেকেই শুরু করা হোক না কেন, ঘুরেফিরে শুধু একটি নামই বারবার উঠে আসবে কেপ ভার্দে। ম্যাচের আগে যে দলটি নিয়ে কেউ ১০০% আশাবাদী ছিল না, সেই দলটিই আজ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার হৃৎস্পন্দন প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল।
ম্যাচের একপর্যায়ে দর্শকদের মনে হচ্ছিল, তারা যেন আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ দলের নাম ভুলে গেছেন! কেপ ভার্দের অসাধারণ ও নিখুঁত খেলা দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি যে এই দলটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসেছে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে আর্জেন্টিনার চেয়ে তারা ৬৩ ধাপ পিছিয়ে থাকলেও, মাঠে তাদের পারফরম্যান্স ছিল একেবারে বিশ্বমানের। এই ম্যাচটি অনেক দর্শককে গত বিশ্বকাপের সেই ফ্রান্স-আর্জেন্টিনার রুদ্ধশ্বাস ফাইনালের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। লুসাইলের সেই উত্তেজনা আর আবেগ আজ পুরোপুরি ভর করেছিল মায়ামির গ্যালারিতে।
তবে এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় চমক ছিল অন্য জায়গায়। ফুটবলের জাদুকর ও রেকর্ড গড়া লিওনেল মেসিকেও আজ যেন কিছুটা ছায়ায় ঢেকে দিতে পেরেছে কেপ ভার্দে। এই ম্যাচটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াই। শক্তিশালী গোলিয়াথ হলো আর্জেন্টিনা, আর ডেভিড যেন ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে। কিন্তু ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাস সবার জন্যই সমান। নিজেদের দিনে যারা ভালো খেলে, জয় তাদেরই হয়। মায়ামি স্টেডিয়াম ঘরের ছেলে লিওনেল মেসির দলের জয়ে হয়তো হেসেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা বুকে টেনে নিয়েছে হার না মানা কেপ ভার্দেকেও।
কেপ ভার্দের জন্য এই ম্যাচে হারানোর কিছু ছিল না, কিন্তু পাওয়ার ছিল অনেক কিছু। জয় ছাড়া ভালোবাসা, সম্মান, মর্যাদা আর সমীহ সব কিছুই তারা কুড়িয়ে নিয়েছে। পরাক্রমশালী আর্জেন্টিনাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে তাদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে পারফর্ম করতে হতো, আর তারা ঠিক তা-ই করেছে। মাঠে পুরো সময়টাতে তারা নিজেদের উজাড় করে দিয়েছে। রক্ষণভাগ থেকে শুরু করে আক্রমণ সব জায়গায় তারা একসঙ্গে উঠেছে আবার একসঙ্গে নিচে নেমেছে। যখন যা করা প্রয়োজন ছিল, তারা ১০০% নিখুঁতভাবে তা-ই করেছে।
আগের ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে অতিমানবীয় পারফর্ম করা কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া এই ম্যাচেও ছিলেন একেবারে অনন্য। ওয়ান টু ওয়ান পরিস্থিতিতে তিনি মেসিকে একাধিকবার হতভম্ব করে ছেড়েছেন। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া ফ্রি-কিক থেকেও তিনি মেসির একাধিক শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দিয়েছেন। ভোজিনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে মেসি একটি গোল পেলেও, বাকি সময়টাতে অবাক হয়ে শুধু এই গোলরক্ষকের জাদুই যেন দেখে গেছেন।
৪০ বছর বয়সী ভোজিনিয়া আজ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মেসিকে যে হতাশা উপহার দিয়েছেন, তা মেসি হয়তো অনেক দিন মনে রাখবেন। সবাই যখন মেসির পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে তাকে মানুষ ভাবতেই ভুলে গিয়েছিল, তখন কদিন আগপর্যন্তও ‘অখ্যাত’ থাকা এই গোলরক্ষক যেন বুঝিয়ে দিলেন, মেসিও রক্ত-মাংসের একজন সাধারণ মানুষ। সব মিলিয়ে ভোজিনিয়া এই ম্যাচে একাই ৮টি নিশ্চিত গোল সেভ করেছেন। কোনো কোনো সেভে তিনি এমনভাবে বলের সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, যা দেখে মনে হয়েছে তিনি তার জীবন বাজি রেখে খেলছেন।
এই ম্যাচ হেরে কেপ ভার্দে হয়তো বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল, কিন্তু তারা প্রমাণ করে দিল যে ফুটবলে ছোট দল বা বড় দল বলে কিছু নেই। বিশ্বকাপের মঞ্চে যে কেউ যেকোনো সময় চমক দেখাতে পারে। আর কেপ ভার্দের এই অসাধারণ লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের মনে অনেক দিন বেঁচে থাকবে।














