সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দিন গুনছেন ১৪ হাজার ৩৮৪ জন তরুণ-তরুণী। চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর ৫ মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তারা এখনো ক্লাসরুমে ফিরতে পারেননি। নিয়োগের সব ধাপ সফলভাবে পার করার পরও কেবল ‘ভেরিফিকেশন’ বা তথ্য যাচাইয়ের জালে আটকে আছে তাদের ভবিষ্যৎ। এই দীর্ঘ অপেক্ষায় একদিকে প্রার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন, অন্যদিকে দেশের ৬৫,০০০ এর বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করছে। দ্রুত এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ না হলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এরপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচিত প্রার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ডোপ টেস্ট সম্পন্ন করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। প্রার্থীরা তাদের সব সনদ যাচাইয়ের কাজও ১০০% নির্ভুলভাবে শেষ করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া ভেরিফিকেশন রিপোর্টও প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে বর্তমানে একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই চলছে। এই শেষ ধাপটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন নিয়োগপত্র ইস্যু করতে পারছে না। ফলে সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার প্রার্থী এখন বেকারত্বের তকমা নিয়ে ঘরে বসে আছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী এই পরিস্থিতির বিষয়ে বলেন, ভেরিফিকেশন একটি চলমান প্রশাসনিক কাজ এবং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, অধিদপ্তর সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। মন্ত্রণালয় থেকে গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পেলেই তারা নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু করবেন। তবে এই ‘চলমান প্রক্রিয়া’ ঠিক কবে নাগাদ শেষ হবে, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ অধিদপ্তর জানাতে পারেনি। প্রশাসনের এই ধীরগতির কারণে প্রার্থীরা সামাজিক এবং পারিবারিকভাবে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। ৫ মাস ধরে ঝুলে থাকা এই নিয়োগ নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নির্বাচিত প্রার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেরই অন্য চাকরিতে আবেদনের বয়স শেষ হয়ে গেছে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর তারা অন্য কোনো কাজের চেষ্টাও করেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রার্থী বলেন, “আমরা সব পরীক্ষায় পাস করার পর ভেবেছিলাম দ্রুতই স্কুলে যোগ দেব। কিন্তু এখন একেকটি দিন কাটছে বছরের মতো। আমাদের পরিবারগুলো অনেক আশা নিয়ে বসে আছে। অথচ ভেরিফিকেশনের দোহাই দিয়ে আমাদের মাসের পর মাস বসিয়ে রাখা হয়েছে।” অনেক প্রার্থী দাবি করছেন, বর্তমানে ডিজিটাল যুগে তথ্য যাচাই করতে এত দীর্ঘ সময় লাগা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। মে মাসে শিক্ষামন্ত্রী দ্রুত নিয়োগের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, এই নিয়োগ বিলম্বিত হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। সারাদেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে অনেক স্কুলেই প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা অনেক কম। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে একজন শিক্ষককে ৪-৫টি ক্লাস সামলাতে হচ্ছে। এই ১৪ হাজার ৩৮৪ জন নতুন শিক্ষক যোগ দিলে মাঠপর্যায়ের এই সংকট অনেকটাই কেটে যেত। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শিক্ষকদের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা না হলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের শিক্ষার মান প্রায় ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্প্রতি উচ্চ আদালতের একটি রায়ের ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩৬,২৩৫ জন সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়ার আইনি বাধা এখন আর নেই। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষক যখন পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হবেন, তখন সমসংখ্যক সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে সামনে প্রায় ৩৮,৪৩৩টি নতুন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিশাল শূন্যতা পূরণ করতে হলে বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করা অপরিহার্য। প্রশাসন যদি এখন থেকেই তৎপর না হয়, তবে এই শিক্ষক সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
নিয়োগ প্রত্যাশীদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যাও বটে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য ভেরিফিকেশন অবশ্যই জরুরি, তবে তা একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে শেষ হওয়া উচিত। প্রার্থীরা মনে করছেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যদি দ্রুত তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়, তবে চলতি মাসের মধ্যেই তারা নিয়োগপত্র পেতে পারেন। এতে করে হাজারো পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন গতির সঞ্চার হবে। সরকারি চাকুরিতে স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি নিয়োগের গতি বাড়ানোও প্রশাসনের একটি অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত।
পরিশেষে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই বিশাল জনবল নিয়োগের বিষয়টি ঝুলে থাকায় শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উচিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে দ্রুত ভেরিফিকেশন রিপোর্ট সংগ্রহ করা। ১৪ হাজার ৩৮৪ জন মেধাবী তরুণ যখন স্কুলে শিশুদের পাঠদানে ব্যস্ত থাকার কথা, তখন তারা সরকারি অফিসের বারান্দায় ঘুরছেন। এই অবস্থার অবসান ঘটাতে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিক্ষা খাতের উন্নয়নে শিক্ষক নিয়োগের চেয়ে বড় কোনো অগ্রাধিকার থাকতে পারে না। তাই সব আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করাই হবে এখনকার সেরা সমাধান।














