ধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা: আমেরিকার তিন দফা হামলা, পাল্টা জবাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আমেরিকা তৃতীয়বারের মতো ইরানের ওপর ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। তেহরান সরাসরি ঘোষণা করেছে যে, তারা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ রাখবে। এই ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে তেলের বাজার নিয়ে এক বড় ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% এই সরু জলপথ দিয়েই যাতায়াত করে। আমেরিকার এই হামলার পর ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর ওপর পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই হামলার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। পেন্টাগনের তথ্যমতে, সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি মালবাহী জাহাজে ইরান হামলা চালানোর পর ট্রাম্প এই কঠোর পাল্টা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের উপকূলীয় শহরগুলোর যে সক্ষমতা রয়েছে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করার, তা ধ্বংস করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, দেশটির বুশেহর, আসালুয়েহ এবং বন্দর আব্বাসের মতো বড় বড় তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছে। পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাফ জানিয়েছেন, ইরান ভুল পথ বেছে নিয়েছে এবং এখন তাদের এই কাজের মাসুল দিতে হচ্ছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) অবশ্য এই উত্তেজনার জন্য আমেরিকাকেই পুরোপুরি দায়ী করছে। তারা বলছে, আমেরিকা দক্ষিণ হরমুজ প্রণালিতে ইচ্ছা করে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে এবং বিভিন্ন জাহাজকে উসকানি দিচ্ছে। এই অপকর্মের প্রতিশোধ হিসেবে ইরান রবিবার ভোরে কুয়েত, জর্ডান এবং কাতারে অবস্থিত আমেরিকার মিত্রদের অন্তত ৫টি ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। জর্ডান সরকার নিশ্চিত করেছে যে, তাদের ভূখণ্ডে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, কেবল কিছু স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে।

কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতেও তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কাতার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনেকগুলো ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে, তবে সেগুলোর ভাঙা অংশ নিচে পড়ে অন্তত ৩ জন সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। এছাড়া কুয়েতেও ইরানের ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরান দাবি করেছে, তারা কুয়েতে অবস্থিত আমেরিকার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং একটি গোলাবারুদ ও রাডার কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে এই সফল হামলা চালিয়েছে। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং রাডার স্টেশনেও ইরান হামলা করেছে বলে তাদের সামরিক বাহিনী বড় গলায় দাবি করেছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়াটা হবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বিপর্যয়। ইতিহাস বলছে, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অন্তত ১/৫ অংশ বা ২০% এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পার হয়। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছিল, এই হামলার ফলে তা এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল মিলে যে যুদ্ধের সূচনা করেছিল, এই পাল্টাপাল্টি হামলা সেই সংঘাতকে আরও ভয়াবহ রূপ দিচ্ছে।

এই রণদামামার মধ্যেও অবশ্য দুই পক্ষই আলোচনার পথ একদম বন্ধ করে দেয়নি। তবে যুদ্ধের ময়দানের ছবি বলছে ভিন্ন কথা। ইরান দাবি করছে যে, হরমুজ প্রণালিতে তারা কেবল মার্কিন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের দাঁতভাঙা জবাব দিচ্ছে। আইআরজিসি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষায় তারা ১০০% প্রস্তুত এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে। আমেরিকার পক্ষ থেকেও একই ধরনের হুংকার শোনা যাচ্ছে। পেন্টাগন বলছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ সচল রাখতে সব ধরনের শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবে না।

পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন যেন এক আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। জর্ডান, কাতার ও কুয়েতের মতো দেশগুলো এখন আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত বড় কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি, কিন্তু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের এই লড়াই যদি না থামে, তবে তা অচিরেই একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে। তেলের বাজারে এই উত্তেজনার আঁচ এখনই লাগতে শুরু করেছে। অনেক বড় বড় অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ($) ছাড়িয়ে যেতে পারে অনায়াসেই। এর ফলে সারা বিশ্বে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়বে।

আপাতত পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার জন্য পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে হোয়াইট হাউসের দিকে। ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই ঠিক করে দেবে এই সংঘাত থামবে নাকি আরও বাড়বে। অন্যদিকে ইরানও তাদের সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষ এখন এক বুক আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের লড়াই নয়, এটি এখন পুরো পৃথিবীর জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর এক কালো মেঘ হয়ে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের প্রত্যাশা, উভয় পক্ষই সংযত হবে এবং যুদ্ধের পথ ছেড়ে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ