স্পেনের ওপর চটলেন ট্রাম্প: বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ দিয়ে বললেন ‘ব্যর্থ দেশ’

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

তুরস্কের আঙ্কারায় আয়োজিত পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে এক অভাবনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার এই সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পেনের কড়া সমালোচনা করেন। ট্রাম্প স্পেনকে ন্যাটোর ‘খুবই খারাপ অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন হার্ডলাইন অবস্থানে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, স্পেন তাদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করে না এবং ন্যাটোর কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় না।

সম্মেলনের এক পর্যায়ে ন্যাটোর নতুন মহাসচিব মার্ক রুটের উপস্থিতিতেই ট্রাম্প তাঁর ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি সরাসরি ঘোষণা করেন যে, স্পেনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো মানে হয় না। ট্রাম্প বলেন, “স্পেন একটি ব্যর্থ দেশ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। আমি আমার অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি যেন স্পেনের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেন অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমরা এই দেশটির সঙ্গে আর কোনো ডিল করতে চাই না। এমনকি যাতায়াতও বন্ধ রাখা উচিত। আমি নিশ্চিত, যখন আমরা ১০০% সম্পর্ক ছিন্ন করব, তখন তারা দৌড়ে আমাদের কাছে ফিরে আসবে।” ট্রাম্পের এই বক্তব্যে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ন্যাটোর মহাসচিবকে বেশ অস্বস্তিতে দেখা যায়।

স্পেন কেন ট্রাম্পের বিরাগভাজন হলো, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। ন্যাটো জোটের নিয়ম অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর তাদের মোট জিডিপির অন্তত ২ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় করার কথা। ট্রাম্পের অভিযোগ, স্পেন এই শর্ত পূরণ করছে না এবং আমেরিকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছে। তিনি মনে করেন, স্পেন কেবল আমেরিকার সুবিধাগুলো ভোগ করছে কিন্তু বিনিময়ে কিছুই দিচ্ছে না। ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক মনোভাবের কারণে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ স্পেন ও আমেরিকার মধ্যে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়ে থাকে। হঠাৎ করে এই বাণিজ্য বন্ধ হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

শুধু স্পেন নয়, গ্রিনল্যান্ড নিয়েও নিজের অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত করার একটি পুরনো প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “গ্রিনল্যান্ড আমাদের জন্য এখন বড় একটি মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা একসময় তাদের বড় সুযোগ দিয়েছিলাম আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য, কিন্তু তারা সরাসরি ‘না’ করে দিয়েছিল। তখন আমি খুব একটা জোর দিইনি, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি তারা বড় সুযোগ হারিয়েছে। আমরা সবসময় তাদের পাশে থাকলেও তারা বিপদের সময় আমাদের পাশ কাটিয়ে গেছে।” গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের এই মন্তব্য উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।

বক্তব্যের শেষ দিকে ট্রাম্প বিশ্ব রাজনীতিতে আরও একটি বড় ধাক্কা দেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি চলছিল, তা তিনি আজ থেকেই শেষ করে দিচ্ছেন। ট্রাম্পের মতে, এই চুক্তি আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, ইরান বা স্পেনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে কোনো নরম নীতিতে হাঁটার মুড এখন তাঁর নেই। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পলিসি বা ‘আমেরিকা সবার আগে’ নীতি এখন যে কোনো মিত্র দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে যারা ন্যাটোর বাজেট বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে আমেরিকার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, তাদের প্রতি ট্রাম্পের এমন কঠোর আচরণ নতুন কিছু নয়।

স্পেনকে নিয়ে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপের রাজনীতিতে এক ধরনের বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে ন্যাটোর ঐক্য বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে। যেখানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেখানে ট্রাম্পের এমন ‘ট্রেড ওয়ার’ বা বাণিজ্য যুদ্ধ ঘোষণা হিতে বিপরীত হতে পারে। স্পেনের সাধারণ মানুষ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন, তা এখন দেখার বিষয়। তবে ট্রাম্পের সোজাসাপ্টা কথা হলো, “যারা অর্থ দেবে না এবং পাশে থাকবে না, তাদের জন্য আমেরিকার দরজা বন্ধ।”

এখন প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প কি সত্যিই স্পেনের সঙ্গে কয়েক বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবেন? অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, হঠাৎ করে সব রফতানি ও আমদানি বন্ধ করা বা যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধস নামাতে পারে। কিন্তু ট্রাম্পের ইতিহাস বলছে, তিনি যা বলেন তা কার্যকর করার চেষ্টা করেন। স্পেনের ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষের ওপর এই সিদ্ধান্তের কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে আঙ্কারা থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত। ট্রাম্পের এবারের ন্যাটো সফর যে কেবল সামরিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বড় ধরণের অর্থনৈতিক সতর্কবার্তা, তা এখন পরিষ্কার।

সম্পর্কিত নিবন্ধ