সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের শিশুর সুন্দর সুন্দর ছবি বা ভিডিও আপলোড করা এখন অনেক বাবা-মায়েরই দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই নিরীহ কাজটিই যে কতটা ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা নিয়ে এবার কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। তারা বাবা-মায়েদের পরামর্শ দিয়েছে, শিশুদের ছবি যেন কোনোভাবেই অনলাইনে সবার জন্য উন্মুক্ত বা ‘পাবলিক’ করে না রাখা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে শিশুদের ছবি দিয়ে তৈরি করা যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্টের পরিমাণ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই যুগান্তকারী নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে।
এনসিএ এবং শিশু সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন’ (আইডব্লিউএফ) যৌথভাবে এই নতুন নির্দেশিকাটি জারি করেছে। তারা স্পষ্টভাবে বলেছে, বাবা-মা বা আইনি অভিভাবকদের উচিত নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো সবসময় ব্যক্তিগত বা ‘প্রাইভেট’ করে রাখা। যদি তারা শিশুদের ছবি অনলাইনে দিতেই চান, তবে তা যেন শুধুমাত্র একটি ‘ক্লোজ ফ্রেন্ডস’ বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু গ্রুপের মাধ্যমে শেয়ার করা হয়। সংস্থা দুটি জানিয়েছে, তারা বাবা-মায়েদের ওপর কোনো নিয়ম চাপিয়ে দিচ্ছে না, বরং বর্তমান সময়ের এই ভয়ংকর এআই প্রযুক্তির ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের ১০০% সচেতন করতে চাইছে।
এই নির্দেশিকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো ঘেঁটে পুরোনো সব ছবি মুছে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ অপরাধীরা সেগুলো ব্যবহার করে যেকোনো সময় নতুন করে আপত্তিকর ছবি বানাতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা স্পোর্টস ক্লাবের সঙ্গে সই করা ছবি ব্যবহারের সম্মতিপত্রগুলোও নতুন করে ভেবে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ, এসব চুক্তি হয়তো এআই প্রযুক্তির এমন ভয়াবহ অগ্রগতির কয়েক বছর আগে করা হয়েছিল, যখন সাধারণ ছবি দিয়ে এমন নগ্ন ছবি বানানো একেবারেই অসম্ভব ছিল। এনসিএর জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক টিম রাইট বলেন, বাবা-মায়েদের আজই তাদের অ্যাকাউন্টের ‘প্রাইভেসি সেটিংস’ পরীক্ষা করতে হবে এবং শিশুদের ছবি কারা দেখছে, তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
পরিস্থিতি সত্যিই অনেক বেশি উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইডব্লিউএফের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে এআই দিয়ে তৈরি শিশুর যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্টের পরিমাণ গত এক বছরে প্রায় ১৪% বেড়েছে। সংস্থাটি ২০২৫ সালে এমন ৮ হাজার ২৯টি এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও শনাক্ত করেছে, যেগুলো দেখতে একদম বাস্তবের মতো। আইডব্লিউএফের হটলাইনে ১৮ বছরের কম বয়সী অনেক কিশোর-কিশোরী অভিযোগ করেছে যে, এআই দিয়ে তাদের স্বাভাবিক ছবিকে নগ্নরূপে বিকৃত করার পর অপরাধীরা তাদের কাছে মোটা অঙ্কের ডলার ($) বা টাকা দাবি করে ব্ল্যাকমেল করছে।
‘রিপোর্ট রিমুভ’ নামের একটি গোপন পরিষেবা এ ধরনের আপত্তিকর ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে ফেলার কাজ করে। তারাও জানিয়েছে যে, সম্পূর্ণ পোশাক পরা সাধারণ সেলফিগুলোকে এআইয়ের মাধ্যমে চরম পর্নোগ্রাফিতে রূপান্তর করার অনেক ঘটনা তারা পেয়েছে। ‘চাইল্ডলাইন’ নামের আরেকটি সংস্থার কাছে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী জানিয়েছে, এক অপরিচিত ব্যক্তি তার একটি সম্পূর্ণ ভুয়া নগ্ন ছবি তৈরি করেছে। ছবিটিতে তার নিজের চেহারা এবং শোবার ঘর ব্যবহার করা হয়েছিল, যা সে তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়েছিল। এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে এআই টুল এখন কতটা সহজলভ্য এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
শুধু ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট নয়, যুক্তরাজ্যের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটগুলোও এখন ব্ল্যাকমেলারদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। অপরাধীরা স্কুলের ওয়েবসাইট থেকে শিশুদের ছবি চুরি করে এআই টুলের সাহায্যে সেগুলোকে শিশু যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্টে রূপান্তর করছে এবং পরে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে। এই কারণে ‘আর্লি ওয়ার্নিং ওয়ার্কিং গ্রুপ’ নামের একটি সংস্থা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শিক্ষার্থীদের সহজে চেনা যায়, এমন চেহারার ছবি দ্রুত সরিয়ে ফেলার কড়া পরামর্শ দিয়েছে।
আইডব্লিউএফের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড্যান সেক্সটন অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, শিশুদের ছবি সবার জন্য উন্মুক্ত না রাখার কথা বাবা-মায়েদের বলতে তাঁর নিজেরই খুব অস্বস্তি লাগছিল। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তির দুনিয়ায় শিশুদের নিরাপত্তার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের অন্য সদস্যরা শিশুদের কোনো ছবি অনলাইনে দিচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে এবং এ বিষয়ে তাদের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে। আইডব্লিউএফের বিপণনপ্রধান টম ডাইসন বলেন, “আপনি যদি কোনো ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আপনার শিশুর ছবি সরিয়ে নিতে চান, তবে আপনি আপনার পূর্ণ অধিকার নিয়ে নির্দ্বিধায় তা করতে পারেন।”













