যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হিসাব পাল্টে দিয়ে নতুন নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ইরান

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন গত মাসে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে বসে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেন, তখন বিশ্বের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এটিকে ইতিহাসের এক চরম পরিহাস হিসেবেই দেখেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে ঠিক এই ভার্সাই প্রাসাদে বসে যে চুক্তি সই হয়েছিল, তা পুরো ইউরোপের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই চুক্তিতে জার্মানির ওপর বিশাল ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ায় মাত্র ২০ বছর পরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্পের সই করা এই চুক্তিটিও কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো যুদ্ধের বীজ বপন করল, নাকি এটি সত্যিই একটি স্থায়ী শান্তির পথ দেখাবে? চুক্তির তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো চরম অনিশ্চিত। তবে এর মধ্যেই ইরানের ভেতরে এক গভীর ও যুগান্তকারী পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

ইরান এখন তাদের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষবিদায় জানাচ্ছে। চার মাসেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক ভয়াবহ যৌথ বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। ওই হামলার মাধ্যমেই মূলত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা হয় এবং তেহরান প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশকে হত্যা করা হয়। খামেনির জানাজা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি বড় ভূরাজনৈতিক বার্তাও বটে। এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, পুরোনো নেতৃত্ব এখন নতুন প্রজন্মের হাতে দেশের ভার তুলে দিয়ে বিদায় নিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো ভেবেছিল, শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলেই ইরান দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তাদের জায়গায় এখন আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও শক্তিশালী নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে।

গত জানুয়ারিতে ইরানে যখন ব্যাপক গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, খুব শিগগিরই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটবে। কয়েক দশক ধরে চলমান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই বিধ্বস্ত ছিল। এর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের একটি যুদ্ধের ক্ষতও দেশটি তখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এছাড়া সিরিয়ায় তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন এবং গাজা ও লেবাননে হামাস ও হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হয়। দেশের ভেতরে ও বাইরে এত সব বিপর্যয়ের পর পশ্চিমা বিশ্ব ভেবেছিল যে ইরান এখন অত্যন্ত নাজুক ও দুর্বল অবস্থায় আছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সব ঝড় সামলে এখনো শক্তভাবে টিকে আছে। শুধু টিকে থাকাই নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা তারা দেখিয়েছে। এই সক্ষমতাই মূলত তাদের টিকে থাকতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। ট্রাম্প প্রায়ই দাবি করেন যে তিনি ইরানে শাসকের বদল ঘটিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ভ্যালি নাসর এই দাবির সঙ্গে একমত হলেও তিনি মনে করেন, এই পরিবর্তন আসলে তেহরানের জন্যই বেশি সুবিধাজনক হয়েছে। কারণ, এখন পুরো একটি নতুন ও তরুণ প্রজন্ম ইরানের ক্ষমতায় বসেছে এবং তাদের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যুদ্ধ সামলেছে এবং এখন শান্তিপ্রক্রিয়াও সামলাচ্ছে।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বয়স ৫৬ বছর, যিনি তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির চেয়ে প্রায় ৩০ বছরের ছোট। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বয়স ৭১ বছর। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার আহমদ ভাহিদির বয়সও ষাটের কোঠায়। এই নতুন নেতারা তাদের পূর্বসূরিদের মতো অতি সাবধানী নন, বরং তারা অনেক বেশি সাহসী ও আক্রমণাত্মক। তারা পুরো অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি হামলা চালিয়েছেন, আবার কয়েক সপ্তাহ পরেই মাথা উঁচু করে চুক্তির টেবিলে বসেছেন।

এই বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সর্বাত্মক হামলার মুখে ইরান আর কোনো ধরনের সংযম দেখায়নি। তারা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বাহরাইন ও কাতারের মার্কিন বিমানঘাঁটিতেও তারা হামলা করে। কুয়েতে ইরানের হামলায় ৬ মার্কিন সেনা নিহত হন এবং আরও কয়েক শ সেনা আহত হন। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা ও জাহাজে আক্রমণ চালানোর ঝুঁকি নিতেও ইরান একটুও পিছপা হয়নি। ইরানের এই অভাবনীয় ও আগ্রাসী পাল্টা হামলা হোয়াইট হাউসকে রীতিমতো অবাক করে দিয়েছে।

কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ইরানকে চাপে রাখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ইরানের নাটকীয় পাল্টা হামলা বুঝিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সেই পুরোনো কৌশল আর কাজে আসছে না। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন মার্কিন নিরাপত্তাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, মার্কিন ঘাঁটি তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে উল্টো তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তাই এখন সৌদি আরবসহ বেশির ভাগ উপসাগরীয় দেশ নিজেদের রক্ষার্থে দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের পথ খুঁজছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ