পরিচয়হীন শৈশব, শেষ বিদায়ও বেওয়ারিশ হিসেবে: হামের প্রকোপে ছোটমণি নিবাসের ৫ শিশুর করুণ মৃত্যু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক কোণে দেয়াল ঘেঁষে রাখা ছিল সাদা কাফনে মোড়ানো একরত্তি এক শিশুর নিথর দেহ। ছোট্ট সেই লাশের ওপর সেঁটে দেওয়া কাগজে বড় বড় অক্ষরে লেখা নাম: মাহির, বয়স: ৮ মাস। গত শুক্রবার ভোর থেকেই মাহিরের লাশটি সেখানে পড়ে ছিল। পৃথিবীতে তার আপন বলতে কেউ নেই, তাই শেষ বিদায়ে পাশে বসে কাঁদার মতোও কোনো স্বজন ছিল না। এক বুক হাহাকার নিয়ে গত শনিবার সকালে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কর্মীরা এসে মাহিরকে নিয়ে যান। তার ঠিকানা এখন জুরাইন কবরস্থানের কোনো এক নাম না জানা কবরে। পিতৃ-মাতৃ পরিচয়হীন মাহির এভাবেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিল ‘বেওয়ারিশ’ তকমা নিয়ে।

মাহিরের ছোটবেলাটা আর দশটা স্বাভাবিক শিশুর মতো ছিল না। জন্মের পর থেকেই তার মাথাটি শরীরের তুলনায় বেশ বড় ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গাজীপুরের কাশিমপুর থানার মাধ্যমে আদালতের আদেশে সে ঠাঁই পেয়েছিল রাজধানীর আজিমপুরে সরকারের ‘ছোটমণি নিবাসে’। সেখানে আরও অনেক পরিচয়হীন শিশুর সঙ্গে তার দিন কাটছিল। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে হাম এবং হাম-পরবর্তী নানা শারীরিক জটিলতায় গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তেজগাঁওয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাহির শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। তার ছোট শরীরটি এতটাই হালকা ছিল যে, অ্যাম্বুলেন্সে তোলার জন্য কোনো খাটিয়ার প্রয়োজন পড়েনি। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ক্যারিয়ার মো. কিসমত দুই হাতে কোলে করেই তাকে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত নিয়ে যান। এক নিঃসঙ্গ যাত্রার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এক পরিচয়হীন শিশুর জীবনগল্প।

আজিমপুর ছোটমণি নিবাসে বর্তমানে ৩৮ জন শিশু রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই প্রতিষ্ঠানটিতে ০ থেকে ৭ বছর বয়সী পরিত্যক্ত বা পাচার হওয়া শিশুদের আশ্রয় দেওয়া হয়। কিন্তু গত কয়েক মাসে এখানে হামের প্রাদুর্ভাব মহামারি আকার ধারণ করেছে। ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন জানান, এক জায়গায় অনেক শিশু একসাথে থাকার ফলে হামের মতো ছোঁয়াচে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কেবল মাহির নয়, গত কয়েক সপ্তাহে হাম ও এ সংক্রান্ত জটিলতায় এই নিবাসের মোট ৫টি শিশু মারা গেছে। তানজিনা আফরিন আরও জানান, শিশুদের বাঁচানোর জন্য তারা ১০০% চেষ্টা করছেন, কিন্তু প্রকট জনবল সংকট এবং শিশুদের আগে থেকেই থাকা অপুষ্টি ও অসুস্থতা তাদের কাজকে কঠিন করে তুলছে।

মাহিরের আগে একই নিবাসের মুনা, খুশবু, আরিশা ও মেহেদী নামে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মুনার বয়স হয়েছিল মাত্র ৩ মাস ১৮ দিন। তার মা ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। ফরিদপুর থেকে উদ্ধার হওয়া এই শিশুটিও হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। অন্যদিকে ৯ মাস বয়সী খুশবুর গল্পটি আরও করুণ। তার মা খুন হয়েছিলেন এবং বাবা সেই খুনের দায়ে বর্তমানে কারাগারে। খুশবুর দেখাশোনা করার মতো কোনো আত্মীয় না থাকায় আদালত তাকে ছোটমণি নিবাসে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু হামের বিষাক্ত থাবা খুশবুকেও বাঁচতে দেয়নি। এভাবে একে একে পাঁচটি প্রাণ ঝরে যাওয়ায় ছোটমণি নিবাসের কর্মীদের মধ্যে শোক ও আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের পরিবেশও ছিল বেশ অস্বস্তিকর। সেখানে এসি থেকে পানি পড়ছিল এবং মরদেহের পচা গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে ছিল। মাহিরের লাশ হস্তান্তরের সময় উপস্থিত ছিলেন ছোটমণি নিবাসের অফিস সহকারী আয়েশা বেগম। তিনি ২০২২ সাল থেকে সেখানে কাজ করছেন। আয়েশা বিষণ্ণ মনে বলছিলেন, এর আগে কখনোই এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এতগুলো শিশুর মৃত্যু তিনি দেখেননি। প্রতিটি শিশুই কোনো না কোনো করুণ ইতিহাস নিয়ে এখানে এসেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা রাষ্ট্রের খাতায় বেওয়ারিশ হিসেবেই থেকে গেল। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামের পাশাপাশি এই শিশুদের অনেকেরই স্ক্যাবিস বা চুলকানি এবং নিউমোনিয়ার মতো সমস্যা ছিল।

আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় ২০ জন শিশুকে হাম ও বসন্তের কারণে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সমীর মল্লিক বলেন, তারা শিশুদের পুষ্টিকর খাবার এবং উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে জনবল সংকট এবং শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় মৃত্যুহার কমানো যাচ্ছে না। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, বর্তমানে আর কোনো শিশু হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি নেই, যা কিছুটা স্বস্তির খবর। তবে মাহির বা খুশবুর মতো শিশুদের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।

একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন সে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে আসে। কিন্তু ছোটমণি নিবাসের এই শিশুদের জীবন শুরু হয় পরিত্যক্ত অবস্থায় আর শেষ হয় অবহেলা ও রোগে। মাহিরের লাশটি যখন জুরাইন কবরস্থানের দিকে যাচ্ছিল, তখন অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের আসনে সেটি পড়ে ছিল একা। কোনো মা তার সন্তানের কপালে শেষ চুমু দেননি, কোনো বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েননি। শুধু পুলিশের সাধারণ ডায়েরি আর আদালতের কিছু কাগজই ছিল তার অস্তিত্বের প্রমাণ। এই ৫ শিশুর অকাল মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষায় আমাদের ব্যবস্থা এখনো কতটা অপ্রতুল।

মারা যাওয়া প্রতিটি শিশুর জন্য থানায় সাধারণ ডায়েরি করা এবং ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনের জন্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়েছে। ছোটমণি নিবাসের প্রতিনিধিরা হাসপাতালেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে বিদায় নেন। এরপর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে ধর্মীয় রীতি মেনে তাদের দাফন করা হয়। পরিচয়হীনভাবে জন্মানো এই শিশুরা কবরেও শায়িত হলো পরিচয়হীনভাবে। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতা এখানে কতটুকু, সেই প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে কেন এভাবে পাঁচটি প্রাণ ঝরে যাবে, তার উত্তর হয়তো কারো কাছে নেই।

সম্পর্কিত নিবন্ধ