ঢাকার রাজপথে গতকালের চিত্র ছিল এক কথায় ভয়াবহ। ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালানো সোহরাব সরদারের কথাই ধরা যাক। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাকে দেখা গেল মিরপুরের কাজীপাড়ায় হাঁটুপানিতে বিকল হওয়া মোটরবাইকটি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন। মগবাজার গিয়ে এটি সারাতে হবে। সারা দিনের আয় তো দূরের কথা, পকেটের টাকা খরচ করে বাইক সারাতে গিয়ে সোহরাবের চোখেমুখে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ। সোহরাবের মতো এমন হাজার হাজার মানুষের জীবিকা গতকাল স্থবির হয়ে পড়েছিল বৃষ্টির কারণে। শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া অবিরাম বৃষ্টিতে ঢাকা যেন এক বিশাল পুকুরে পরিণত হয়েছিল। ঘর থেকে বের হওয়া ১০০% মানুষেরই গতকাল পোহাতে হয়েছে সীমাহীন ভোগান্তি। কোথাও হাঁটু সমান পানি, কোথাও আবার কোমর সমান। অধিকাংশ সড়কে যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে থাকায় যানজট ছিল অসহনীয়। এমনকি অনেক স্কুল-কলেজের পরীক্ষা ও ক্লাস বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ১২টা থেকে রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত অর্থাৎ মাত্র ১২ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যেই হয়েছে ৮২ মিলিমিটার। গত বছরগুলোতেও এমন ভারী বৃষ্টিতে ঢাকা ডুবেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মাত্র ৩ ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই মতিঝিল, গ্রিন রোড ও কমলাপুর এলাকা ১২ ঘণ্টার জন্য পানির নিচে চলে গিয়েছিল। অথচ আমাদের নগরপিতারা বারবার আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, বৃষ্টি থামার ১৫ মিনিটের মধ্যে পানি নেমে যাবে। ২০১৭ সালে তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং ২০২৩ সালে সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এমন গালভরা বুলি শুনিয়েছিলেন। কিন্তু গতকালের ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি সেইসব প্রতিশ্রুতিকে পুরোপুরি মিথ্যা প্রমাণ করেছে। নগরবাসী দেখেছে যে, শুধু মুখের কথায় জলাবদ্ধতা দূর হয় না, যদি না কাজের কাজ কিছু হয়।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে খরচের হিসাব করলে যে কারো চোখ কপালে উঠবে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এক দশকে ঢাকা ওয়াসা এবং দুই সিটি করপোরেশন ড্রেন বা নালা নির্মাণ, সংস্কার এবং খাল পরিষ্কারের নামে অন্তত ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা খরচ করেছে। এর মধ্যে ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যেই খরচ হয়েছে ১ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন দায়িত্ব নেওয়ার পর আরও ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হওয়ার পরও কেন সাধারণ মানুষকে হাঁটুপানি ভেঙে পথ চলতে হচ্ছে? কেন সোহরাবদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই টাকার বড় অংশই হয়তো অপরিকল্পিত প্রকল্পে নষ্ট হয়েছে, যার কোনো সুফল নগরবাসী পাচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, মগবাজার এবং মিরপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো পুরোপুরি পানির নিচে ছিল। বিশেষ করে নিউমার্কেট এলাকার অবস্থা ছিল সবচেয়ে শোচনীয়। দোকানের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়ীদের লোকসান হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এড়াতে সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। এই এলাকার পানি আগে পিলখানার একটি ড্রেন দিয়ে বুড়িগঙ্গায় যেত, কিন্তু ২০০৯ সালের পর নিরাপত্তার কারণে সেই পথটি বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করায় এখন সামান্য বৃষ্টিতেই নিউমার্কেট ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত পড়ে। ব্যবসায়ীদের মতে, গতকালের এই জলাবদ্ধতায় তাদের বেচাকেনা প্রায় ৯০% কমে গেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার এই সমস্যার পেছনে মূলত দুটি কারণ দায়ী। প্রথমত, বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত আউটলেট বা পথ নেই। দ্বিতীয়ত, শহরের খালগুলো এখন দখলদারদের পেটে অথবা ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা। ঢাকা উত্তর সিটির ২৯টি খাল এবং দক্ষিণ সিটির ২৬টি খাল কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর পানিপ্রবাহের ক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। ড্রেন দিয়ে যে পানি খালে যাবে, সেই ড্রেনগুলোও বালু আর পলিথিনে ভরাট হয়ে আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান ঠিকই বলেছেন যে, বিচ্ছিন্নভাবে ড্রেন বানালে কোনো লাভ হবে না। পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেই নিকাশী ব্যবস্থা বা ‘আউটলেট’ সচল না করলে এই ২ হাজার কোটি টাকা খরচ কেবল গড্ডালিকা প্রবাহে জল ঢালার মতোই হবে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা অবশ্য এই জলাবদ্ধতাকে ‘সাময়িক জলজট’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের দাবি, পাম্প স্টেশনগুলো দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার লিটার পানি সরানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ড্রেনের মুখ আবর্জনায় বন্ধ থাকায় পানি পাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারছে না। দক্ষিণ সিটির পাম্পগুলো প্রতি সেকেন্ডে ৫ হাজার লিটার পানি সরাতে পারে ঠিকই, কিন্তু কালভার্ট সরু হওয়ার কারণে পানি সেখানে যেতে পারছে না। ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম গতকাল কাজীপাড়ার অবস্থা দেখে দায় চাপিয়েছেন যত্রতত্র ময়লা ফেলার ওপর। যদিও তিনি আগে দাবি করেছিলেন যে, অধিকাংশ স্থানে তিন ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যাবে। কিন্তু গতকালের পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, তাদের প্রস্তুতির চেয়ে প্রকৃতির তেজ ছিল অনেক বেশি।
বর্তমানে ঢাকার অনেক এলাকাতেই খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে, যা বৃষ্টির দিনে মানুষের বিপদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কাদার কারণে রাস্তা দিয়ে হাঁটা এখন দায়। দিন শেষে দেখা গেল, সেই সোহরাব সরদারের ৩-৪ শ টাকা আয় হয়েছিল, যা বাইক সারাতেই খরচ হয়ে গেছে। অর্থাৎ এক দিন ভিজে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও তার ঘরে কোনো টাকা ফেরেনি। ঢাকার এই জলাবদ্ধতা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি বছরের পর বছর ধরে চলা অব্যবস্থাপনার একটি চরম নিদর্শন। নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি পারবে এই ২ হাজার কোটির অপচয় বন্ধ করে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে? নগরবাসী এখন শুধু আশ্বাসের ১৫ মিনিট নয়, বরং স্থায়ী মুক্তি চায়।














