প্রাথমিক বৃত্তিতে নবাবগঞ্জ মডেল স্কুলের বাজিমাত: ৫৩ জনের মধ্যে ৫২ জনই পেল বৃত্তি!

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
শিক্ষা দিক্ষায় পিছিয়ে থাকা জনপদগুলোর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এক সময় আলোচনায় থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানকার শিক্ষার্থীরা একের পর এক চমক দেখাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অভাবনীয় এক সাফল্য উপহার দিয়েছে নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গতানুগতিক ফলাফলকে ছাপিয়ে এই বিদ্যালয়টি এখন পুরো জেলার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এবারের বৃত্তি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে মোট ৫৩ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিল, যার মধ্যে ৫২ জনই বৃত্তি পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। অর্থাৎ শতকরা হিসেবে এই সাফল্যের হার প্রায় ৯৮.১১% শতাংশ। মাত্র ১ জন শিক্ষার্থীর জন্য শতভাগ সাফল্য হাতছাড়া হলেও, ৫৩ জনের মধ্যে ৫২ জনের এই অর্জনকে স্থানীয়রা ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবেই দেখছেন।

বিদ্যালয়টির অফিস সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, বৃত্তিপ্রাপ্ত ৫২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সাফল্যের মানও বেশ উন্নত। মোট বৃত্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে ৪০ জন শিক্ষার্থী পেয়েছে ‘ট্যালেন্টপুল’ বা মেধা তালিকায় বৃত্তি, যা যে কোনো বিদ্যালয়ের জন্য একটি স্বপ্নের মতো বিষয়। বাকি ১২ জন শিক্ষার্থী সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে। অর্থাৎ অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৭৫.৪৭% শতাংশই ট্যালেন্টপুলে জায়গা করে নিয়েছে। এমন অভাবনীয় ফলাফলের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বইছে খুশির জোয়ার। মিষ্টি বিতরণ থেকে শুরু করে আনন্দ মিছিলে মুখরিত হয়ে উঠেছে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। সাধারণ মানুষের মতে, নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন শুধু জেলার নয়, বরং পুরো বিভাগের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠে পরিণত হওয়ার পথে।

এই সাফল্যের রহস্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লতিফা হক আবেগপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি প্রতিবেদককে জানান, “এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমাদের এই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে একটি ত্রিভুজ সূত্র—শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের সম্মিলিত নিরলস পরিশ্রম। ৫৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫২ জনের এই অর্জন আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, কোনো শিক্ষার্থীর ওপর পড়াশোনার বোঝা চাপিয়ে না দিয়ে বরং খেলার ছলে এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তারা পাঠদান সম্পন্ন করেন। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন ক্লাসেই শেষ করার ফলে শিক্ষার্থীদের কোচিং বা বাড়তি গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভরতা প্রায় ১০০% শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। প্রধান শিক্ষক ভবিষ্যতেও এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং আগামীতে শতভাগ সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

অভিভাবকদের মধ্যে এই ফলাফল নিয়ে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা গেছে। এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, “নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশ খুবই চমৎকার। সরকারি স্কুল হলেও শিক্ষকরা এখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদা নজর দেন। ৫৩ জনের মধ্যে ৫২ জনের এই ফলাফল আসলে প্রমাণ করে যে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে সরকারি স্কুলের ছেলেমেয়েরাও অনেক বড় কিছু করতে পারে।” স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের মতে, বর্তমানে অনেক নামী-দামী বেসরকারি স্কুলে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা খরচ করেও এমন ফলাফল পাওয়া দুষ্কর। অথচ সরকারি এই বিদ্যালয়টি প্রায় বিনা খরচে শিক্ষার্থীদের ট্যালেন্টপুলে বৃত্তির যোগ্য করে তুলছে। যদি এই শিক্ষার মান একটি বেসরকারি বা প্রাইভেট স্কুলে নিশ্চিত করতে হতো, তবে হয়তো মাসে অন্তত ৫০ থেকে ১০০ ডলার ($) সমপরিমাণ টাকা খরচ করতে হতো অভিভাবকদের।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ফলাফল শুধু বিদ্যালয়ের গৌরবই বাড়ায়নি, বরং পুরো চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রাথমিক শিক্ষার চেহারাই বদলে দিয়েছে। যেখানে অনেক স্কুলে বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণের হার ৫০% শতাংশের নিচে থাকে, সেখানে ৯৮% শতাংশের বেশি সাফল্য সত্যিই এক বিরল দৃষ্টান্ত। জেলার অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্যও এই মডেল স্কুলটি এখন একটি অনুসরণীয় মডেলে পরিণত হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, নবাবগঞ্জ মডেল স্কুলের এই অভিজ্ঞ শিক্ষক দল যদি অন্য স্কুলের শিক্ষকদেরও প্রয়োজনীয় টিপস দেন, তবে জেলার শিক্ষার সার্বিক মান কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই অর্জনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করা উচিত যাতে অন্যরাও উৎসাহিত হয়।

সফলতার এই আনন্দযজ্ঞে পিছিয়ে নেই শিক্ষার্থীরাও। ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া এক শিক্ষার্থী জানায়, “আমাদের শিক্ষকরা অনেক যত্ন নিয়ে পড়িয়েছেন। আমরা অনেক সময় ভয় পেতাম কিন্তু লতিফা ম্যাম আমাদের সবসময় সাহস দিতেন। আমাদের সাফল্যের এই ক্রেডিট আমাদের শিক্ষকদের।” ৫৩ জনের মধ্যে ৫২ জন বৃত্তি পাওয়া এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, যা তাদের পরবর্তী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও খুশি, কারণ একটি শিক্ষিত ও দক্ষ প্রজন্মই পারে এলাকার অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে এবং ভবিষ্যতে বেকারত্ব দূর করতে।

সাফল্যের এই জয়গান শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেরা হওয়া সম্ভব। বিদ্যালয়ের এমন গৌরবময় ফলাফলে জেলার সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা প্রধান শিক্ষক লতিফা হকসহ সকল সহকারী শিক্ষকদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। সবার একটাই দোয়া, এই স্কুলটি যেন এভাবেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাম বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল করে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ