‘ও আমার ফোন ধরে না’: সাবেক মন্ত্রী মুরাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মাহিয়া মাহি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঢালিউডের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি বর্তমানে দেশের বাইরে সময় কাটাচ্ছেন। স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে তাঁর প্রবাস জীবনের রঙিন মুহূর্তগুলো সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত শেয়ার করেন তিনি। পর্দার মাহিকে নতুন কোনো সিনেমায় না দেখলেও গত কয়েকদিন ধরে তিনি টক অব দ্য কান্ট্রি। সৌজন্যে সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। প্রায় দুই বছর আগে ফাঁস হওয়া একটি বিতর্কিত ফোনালাপ নিয়ে নতুন করে মুখ খুলেছেন এই নায়িকা। ফেসবুক লাইভে এসে তিনি এমন কিছু তথ্য দিয়েছেন যা রীতিমতো বোমা ফাটানোর মতো। মাহির দাবি, সেই সময় তিনি কতটা অসহায় ছিলেন এবং রাষ্ট্রের প্রভাবশালী একজন ব্যক্তির হাত থেকে বাঁচতে তাঁকে কতটা কৌশলী হতে হয়েছিল, তা এখন সবার জানা দরকার।

মাহিয়া মাহি তাঁর ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও বার্তা শেয়ার করেছেন। ভিডিওটির ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘অসভ্য মুরাদ ও বিহারিদের গাত্রদাহ। সবাইকে একবার শোনার অনুরোধ জানাচ্ছি। এটা একটা নায়িকা না, একজন মায়ের অনুরোধ।’ ভিডিওতে মাহি অত্যন্ত শান্ত গলায় কিন্তু দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, সেই পুরোনো অডিও ক্লিপটি নিয়ে এখনও অনেকে তাঁকে ভুল বুঝছেন এবং আজেবাজে মন্তব্য করছেন। কিন্তু পুরো ঘটনার ভেতরে যে ভয়ংকর এক সত্য লুকিয়ে ছিল, তা সাধারণ মানুষ ১০০% বুঝতে পারেনি। মাহি প্রশ্ন তোলেন, যদি তাঁর সঙ্গে মুরাদের সম্পর্ক ভালোই থাকত, তবে কেন মুরাদকে অন্য মানুষের ফোন ব্যবহার করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হতো?

ভিডিওতে মাহি অডিওর একটি নির্দিষ্ট অংশের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা কি এতটুকুও বোঝেন না? অডিওতে তো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে যে মুরাদ হাসান বলছেন ও তো আমার ফোন ধরবে না। তার মানে হলো আমি তাঁর ফোন রিসিভ করতাম না। আমি তাঁকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে রেখেছিলাম। আমাকে সরাসরি না পেয়ে তিনি অন্য একজনের ফোন দিয়ে আমাকে ফোন করেছিলেন। একজন মানুষ কতটা বিরক্ত হলে এবং কতটা ঘৃণা করলে একজন মন্ত্রীকে ব্লক করে রাখতে পারে, সেটা আপনারা একটু চিন্তা করে দেখুন।’ মাহি জানান, সেই সময় মুরাদ হাসান তাঁকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেছিলেন।

সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্যটি মাহি দিয়েছেন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়ে। ফাঁস হওয়া অডিওতে মুরাদ হাসানকে বলতে শোনা যায় যে তিনি মাহির কাছে র‍্যাব, পুলিশ, এনএসআই এবং ডিজিএফআই পাঠাবেন। মাহি বলেন, ‘একজন প্রতিমন্ত্রী যখন ৪টি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সংস্থার ভয় দেখান, তখন একটা সাধারণ মেয়ের পক্ষে কী করার থাকে? তিনি আমাকে হুমকি দিচ্ছিলেন যে আমাকে তুলে আনা হবে। যদি তাঁর সঙ্গে আমার কোনো গোপন সম্পর্ক থাকত, তবে তিনি কি আমাকে র‍্যাব বা ডিজিএফআই দিয়ে তুলে আনার ভয় দেখাতেন? অবশ্যই না। আমি তাঁকে এড়িয়ে চলতাম বলেই তিনি এমন পৈশাচিক আচরণের হুমকি দিয়েছিলেন।’ মাহি আরও বলেন, জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তিনি তখন মুরাদের সঙ্গে ফোনে নরম সুরে কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন।

মাহি তাঁর অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে বলেন, সেই সময় তিনি মিডিয়া অঙ্গনের অনেক প্রভাবশালী মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। অনেক সিনিয়র সহকর্মী জানতেন যে মুরাদ হাসান তাঁকে সারাক্ষণ বিরক্ত করছেন। মাহি বলেন, ‘আমি যাঁদের যাঁদের চিনতাম, সবাইকে বলেছি যে মুরাদ হাসান আমাকে ডিস্টার্ব করছেন, আমাকে বাঁচান। কিন্তু সবাই বলতেন উনি তো সরকারের একজন শক্তিশালী মন্ত্রী, আমরা কী করব? আমাদের কিছুই করার নেই।’ এমনকি কয়েকজন সহকর্মী রাত ১১টার পর মাহিকে সতর্ক করে বলতেন যেন তিনি তাঁদের ফোন রিসিভ না করেন। কারণ সেই সময় মুরাদ হাসান তাঁদের সামনে থাকতেন এবং তাঁদের ফোন কেড়ে নিয়ে মাহিকে কথা বলতে বাধ্য করার চেষ্টা করতেন।

ভিডিওতে মাহি আক্ষেপ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গও টানেন। তিনি বলেন, ‘আমি যদি সেই সময় সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাতে পারতাম, তবে অবশ্যই অভিযোগ করতাম। আমার বিশ্বাস ছিল তিনি ব্যবস্থা নিতেন। কিন্তু তাঁর কাছে যাওয়ার মতো কোনো পথ আমার সামনে খোলা ছিল না। মাঝখানে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সবাই মুরাদের ভয়ে চুপ থাকতেন।’ মাহি আরও বলেন, অনেকে তাঁর হাসিমুখে কথা বলা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের উদ্দেশে মাহির সাফ জবাব, ‘আমি যদি তাঁর সঙ্গে গালিগালাজ করতাম বা অভদ্র আচরণ করতাম, তবে পরের মুহূর্তেই হয়তো আমার বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেত। আমার জীবনের দায়িত্ব কি কেউ নিত? সেই সময় টিকে থাকার জন্য আমাকে ভদ্রভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে।’

মাহিয়া মাহির এই ভিডিও বার্তা এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল। তিনি দাবি করেছেন, মুরাদ হাসানের এমন লালসার শিকার কেবল তিনিই নন, মিডিয়া জগতের আরও অনেক নারীই হয়েছেন। মাহির মতে, চিত্রনায়িকা থেকে শুরু করে সংবাদ উপস্থাপিকা এবং গায়িকা অনেকেই মুরাদের এই আচরণের কারণে মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছেন। তিনি ১০০% নিশ্চিত করে বলেন যে, আরও অনেক নারী শিল্পী আছেন যাঁরা এখনো লোকলজ্জার ভয়ে মুখ খুলছেন না। মাহি চান, তাঁর এই সাহসিকতা দেখে অন্যরাও যেন সোচ্চার হন। তিনি মনে করেন, একজন মা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব সত্যটা সবার সামনে তুলে ধরা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মেয়েকে এভাবে হেনস্তার শিকার হতে না হয়।

বর্তমানে মাহি স্বামী রাকিব সরকারের সাথে সুখে সংসার করছেন। চলচ্চিত্র থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও তিনি এখন নিজের পরিবার ও সন্তানকে নিয়েই বেশি চিন্তিত। মাহির এই ভিডিও বার্তার পর মুরাদ হাসান বা সরকারের কোনো পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য আসেনি। তবে নেটিজেনরা মাহির এই সাহসী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কোনো নারীকে এভাবে হেনস্তা করা জঘন্য অপরাধ। মাহির এই বিস্ফোরক বক্তব্যের পর চলচ্চিত্র পাড়ায় নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সবাই এখন মাহির পাশে দাঁড়িয়ে বিচারের দাবি জানাচ্ছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ