পাহাড়ি ঢলে ভাসছে দীঘিনালা: বানভাসি আড়াই হাজার পরিবারের পাশে জেলা পরিষদ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পাহাড়ের মানুষের কাছে বৃষ্টি মানেই এখন এক আতঙ্কের নাম। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাইনী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। এই ভয়াবহ দুর্যোগে যখন হাজার হাজার মানুষ দিশেহারা, তখন তাদের আশার আলো হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ। শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে উপজেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মেরুং ও কবাখালী ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় আড়াই হাজার (২,৫০০) পরিবারের মাঝে জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এই মানবিক উদ্যোগে বন্যায় সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর মুখে অন্তত এক বেলার খাবারের নিশ্চয়তা মিলেছে।

শুক্রবার দুপুরের কড়া রোদ আর কাদার মধ্যে দীঘিনালার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা নিজে উপস্থিত থেকে প্রতিটি পরিবারের হাতে ত্রাণের প্যাকেট তুলে দেন। বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো মানুষের কান্নায় সিক্ত হয় পরিবেশ। চেয়ারম্যান একে একে আড়াই হাজার মানুষের হাতে চাল, ডাল, তেল ও শুকনো খাবার তুলে দেন। তিনি যখন দুর্গতদের সাথে কথা বলছিলেন, তখন অনেকেই তাদের ভিটেমাটি হারানোর করুণ গল্প শোনান। এই ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম কেবল একটি সরকারি কর্মসূচি ছিল না, বরং এটি ছিল অসহায় মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য নজির।

এবারের বন্যায় দীঘিনালার কৃষি ও অবকাঠামো খাতের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। প্রাথমিক এক হিসেবে দেখা গেছে, উপজেলার প্রায় ৭০% ফসলি জমি এখন পানির নিচে। কৃষকদের লাগানো আমন ধানের বীজতলা ও সবজি ক্ষেত ১০০% নষ্ট হয়ে গেছে। এই ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রায় $১.৫ মিলিয়ন (দেড় মিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত হওয়ায় এবং কালভার্ট ভেঙে যাওয়ায় অনেক দুর্গম এলাকার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ৮০% বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এমন কঠিন সময়ে জেলা পরিষদের এই ২,৫০০ প্যাকেট ত্রাণ ছিল বন্যার্তদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।

ত্রাণ বিতরণকালে এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, “বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কেবল দায়িত্ব নয়, এটি একটি মানবিক দায়বদ্ধতা। পাহাড়ের কোনো মানুষ যেন খাদ্য সংকটে কষ্ট না পায়, সেজন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।” তিনি আরও জানান, জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে এই ত্রাণ কর্মসূচির জন্য ইতোমধ্যে প্রায় $২৫,০০০ (পঁচিশ হাজার ডলার) সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তবে সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানো হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, ত্রাণ বিতরণে যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়, সেদিকে ১০০% নজরদারি রাখা হচ্ছে।

উক্ত ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সরব উপস্থিতি ছিল। উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আবছার। তারা প্রত্যেকেই দুর্গতদের খোঁজখবর নেন এবং উদ্ধার কাজে স্থানীয় যুবকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এছাড়াও উপজেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলাম সফি ও সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দিনভর ত্রাণ কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সবাই যখন বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে সাহসের সঞ্চার হয়েছে।

মেরুং ইউনিয়নের বাসিন্দা সোনা মিয়া, যার ঘরটি পাহাড়ি ঢলে ধসে গেছে, তিনি ত্রাণ হাতে নিয়ে বলেন, “ঘরের চাল-ডাল সব ভিজে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ছোট বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্টে ছিলাম। আজকের এই খাবারগুলো পেয়ে অনেক বড় উপকার হলো।” সোনা মিয়ার মতো এমন হাজারো মানুষের ঘরে এখন হাহাকার চলছে। জেলা পরিষদের দেওয়া প্রতিটি ত্রাণের প্যাকেটে ছিল ৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ লিটার সয়াবিন তেল এবং প্রয়োজনীয় ওরস্যালাইন। বন্যার পানি নেমে গেলে পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সতর্ক করা হয়েছে এবং জেলা পরিষদ থেকে বিশুদ্ধ পানি পানের জন্য বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দীঘিনালার এই দুর্যোগ কেবল প্রকৃতির খেয়াল নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের এক নিষ্ঠুর প্রভাব। পাহাড় কাটার ফলে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন অল্প বৃষ্টিতেই বন্যা দেখা দিচ্ছে। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জানান, তারা কেবল জরুরি ত্রাণ দিয়েই ক্ষান্ত হবেন না; বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামতে টিন ও নগদ অর্থ সহায়তার পরিকল্পনা করছেন। তিনি বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা অন্তত ১০% উদ্বৃত্ত আয় এই দুর্গতদের কল্যাণে ব্যয় করেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে পাহাড়ের এই ক্ষত সারিয়ে তুলতে।

পরিশেষে বলা যায়, দীঘিনালার এই ত্রাণ কর্মসূচি বন্যার্তদের মনে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন জাগিয়েছে। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের এই কর্মতৎপরতা মানুষের আস্থা বাড়িয়ে দিয়েছে। মাইনী নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও মানুষের দুর্গতি এখনো কাটেনি। তবে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে দেওয়া এই আশ্বাস‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাশে থাকব’দীঘিনালাবাসীকে নতুন দিনের প্রেরণা দিচ্ছে। আজকের এই আড়াই হাজার পরিবারের মুখে যে হাসি ফুটেছে, তা যেন স্থায়ী হয় এবং আগামীতে বন্যা মোকাবিলায় আরও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ