বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের অবসান ঘটল। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নয়, বরং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। আজ বৃহস্পতিবার আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই বড় ঘোষণা দিয়েছেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় বহাল থাকায় এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণেই এই পথ পরিষ্কার হলো। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে।
আজ সকালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আপিল খারিজ করে দিয়েছেন। এর ফলে হাইকোর্টের আগের দেওয়া সেই রায়টিই চূড়ান্তভাবে বহাল থাকল, যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক বলা হয়েছিল। আদালতের এই আদেশের পরপরই সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেন, “ইনশা আল্লাহ, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হবে। এটি আমাদের সরকারের ১০০% রাজনৈতিক অঙ্গীকার।”
মন্ত্রী আরও যোগ করেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি এক সময় বিএনপির আন্দোলনের ফসল ছিল। দেশের মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। আদালত আজ যে রায় দিয়েছেন, তা জনগণের ইচ্ছারই প্রতিফলন। আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর পর দেশে আবার নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ ফিরে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এই রায়ের ফলে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট হয়তো এবার দূর হবে।
এদিকে আদালতের রায়ের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়টি বহাল রেখেছেন। এর মানে হলো, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছিল, তার বড় একটি অংশ এখন বাতিল হয়ে গেল।” তিনি আরও জানান, হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গণভোটের বিধান আবার চালু করার কথা বলা হয়েছিল। আজ আপিল বিভাগের রায়ের পর সংবিধানে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বাতিলের সিদ্ধান্তও বহাল থাকল। ফলে এখন থেকে সংবিধানের ওপর কোনো আঘাত আসলে বা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলে তার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান বলবৎ থাকবে।
২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছিল। সেই সময় সংবিধানের প্রায় ৫৪টি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমেই মূলত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চিরতরে বিলুপ্ত করা হয়েছিল। একই সাথে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মতো মূলনীতিগুলো ফিরিয়ে আনা হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর থেকেই দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বিরোধীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে গত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা প্রশ্ন ওঠে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে এক রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপরই পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হয়। বিশিষ্ট নাগরিক ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তি এই সংশোধনীর কয়েকটি ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায় দেন। সেই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দেওয়া সংক্রান্ত সংবিধান আইনের ২০ ও ২১ নম্বর ধারাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। আজ আপিল বিভাগ সেই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো খারিজ করে দিয়ে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটালেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে সংবিধানে আবার সেই পুরনো ভারসাম্য ফিরে আসবে। এখন থেকে কোনো সরকার চাইলেই নিজের অধীনে নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। সাধারণ মানুষের ভোটের মর্যাদা রক্ষায় একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ল। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান মনে করেন, এই ব্যবস্থা পুনরায় চালু হলে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত হবে এবং দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, সরকার কোনোভাবেই জনগণের আমানত তথা ভোটের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেবে না।
পরিশেষে, পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের এই আইনি বিজয়কে দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ নিজেদের জয় হিসেবে দেখছেন। নির্বাচন কমিশন এখন থেকে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পরিবেশ তৈরির সুযোগ পাবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আগামী নির্বাচনে তারা কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। সরকারের এই ঘোষণা এবং আদালতের রায় কার্যকর হলে বাংলাদেশ আবার গণতান্ত্রিক ধারায় শক্তিশালীভাবে ফিরে আসবে—এমনটাই এখন সবার কাম্য।













