মালিকুজ্জামান কাকা, যশোর
যশোর সদর উপজেলার ১০ নম্বর চাঁচড়া ইউনিয়নে এখন এক আতঙ্কের নাম ‘মামা-ভাগ্নে পরিষদ’। এই স্বঘোষিত পরিষদের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। বিচারের নামে প্রহসন, নিরীহ মানুষকে মারধর, চাঁদাবাজি এবং মাদক কারবারিদের মদদ দেওয়ার মতো গুরুতর সব অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। প্রতিদিন ইউনিয়নের কোনো না কোনো এলাকায় এই পরিষদের পাণ্ডা ও তাদের চ্যালা-চামুণ্ডাদের হাতে সাধারণ মানুষ লাঞ্ছিত হচ্ছেন। বর্তমানে চাঁচড়া এলাকায় এই পরিষদকে নিয়ে বইছে সমালোচনার ঝড়, মানুষের মনে জমেছে তীব্র ক্ষোভ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চলা গুটিকয়েক টাউট প্রকৃতির লোক নিয়ে এই কথিত পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এই চক্রের মূল হোতা বা ‘মামা’ হলেন চাঁচড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফজলুল আলম। আর তার ডান হাত তথা ‘ভাগ্নে’ হিসেবে পরিচিত ইউনিয়ন বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মান্নান। মান্নান চাঁচড়া মধ্যপাড়ার সামাদের ছেলে। তাদের এই অপকর্মে সরাসরি সহযোগিতা বা কো-অর্ডিনেটরের ভূমিকা পালন করছেন ইউনিয়ন বিএনপির যুব বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান আশা এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি ‘গ্যাস বাবু’। এই চারজনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা চক্রটি পুরো ইউনিয়নকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে শাসন ও শোষণ চালাচ্ছে।
এই পরিষদের কর্মকাণ্ডের ধরন দেখলে যে কেউ আঁতকে উঠবেন। সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যেমন—ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড, বিধবা ভাতা কিংবা বয়স্ক ভাতা করে দেওয়ার নাম করে তারা অসহায় মানুষের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, এলাকায় কোনো ছোটখাটো বিবাদ দেখা দিলে তারা স্বেচ্ছায় ‘বিচারক’ সেজে বসেন। এরপর বিচারের নামে চলে প্রহসন এবং দুই পক্ষ থেকেই মোটা অঙ্কের টাকা আদায়। এমনকি চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে বিল না দিয়ে চলে যাওয়া এখন তাদের নিত্যদিনের স্বভাব। কেউ প্রতিবাদ করলে জোটে মারধর আর হুমকি।
সম্প্রতি চাঁচড়া ট্রাক্টর পার্টস ব্যবসায়ী ‘মোটা মিলন’ এই চক্রের নির্মম শিকার হয়েছেন। গত সপ্তাহে ভাগ্নে আব্দুল মান্নান ও গ্যাস বাবু মিলনকে আটকে রেখে বেদম মারধর করেন। তার অপরাধ ছিল খুবই তুচ্ছ; মিলনের একটি গাড়ি ভুলবশত গ্যাস বাবুর গেটে সামান্য ধাক্কা দিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ওই গেটের ক্ষতি হলে মেরামতে বড়জোর ১ থেকে ২ হাজার টাকা খরচ হতো। কিন্তু গায়ের জোর দেখিয়ে এবং প্রহসনের সালিশ বসিয়ে মিলনের কাছ থেকে নগদ ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এই সালিশের সময় ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ টগর উপস্থিত থাকলেও তিনি কোনো প্রতিবাদ করেননি। ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ নিয়ে ১০০% আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
আর্থিক জালিয়াতির ক্ষেত্রে আব্দুল মান্নানের হাত অনেক লম্বা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি চাঁচড়া আমবাগান এলাকার পারুলের কাছ থেকে আবাসনে ঘর দেওয়ার নাম করে ১৭,০০০ (সতেরো হাজার) টাকা নিয়েছেন। নজরুলের স্ত্রীর কাছ থেকে কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ৩,০০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সবচেয়ে বড় জালিয়াতি করেছেন হাসিনার সাথে; তার কাছ থেকে ২,০০,০০০ (দুই লাখ) টাকা নিয়ে এখন আর ফেরত দিচ্ছেন না। পাওনা টাকা চাইতে গেলে উল্টো হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। দরিদ্র মানুষের জমানো এই টাকা আত্মসাৎ করে পরিষদের নেতারা বিলাসী জীবন যাপন করছেন।
মাদক কারবারের ক্ষেত্রেও চাঁচড়া কলোনি এখন এই পরিষদের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী আশরাফ, সোহাগ, রুবেল ও নূর আলমকে সরাসরি আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় এই মামা-ভাগ্নে পরিষদ। মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই বর্তমানে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকলেও তাদের সিন্ডিকেট সচল রাখতে পর্দার আড়াল থেকে কাজ করছে এই চক্রের নেতারা। মাদক কারবারিদের সাথে নেতাদের নিয়মিত ওঠাবসা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফলে এলাকায় যুবসমাজ ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছে।
চাঁচড়া এলাকাটি দীর্ঘকাল ধরে বিএনপির একটি শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই মুষ্টিমেয় কয়েকজনের অপকর্মের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির প্রতি বিরূপ ধারণা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই চক্রের অত্যাচারে বিএনপির ভোট ব্যাংকে অন্তত ৩০% থেকে ৪০% ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভোটাররা এখন প্রকাশ্যেই ক্ষোভ ঝাড়ছেন। তারা মনে করছেন, দ্রুত এই ‘মামা-ভাগ্নে’ সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলটিকে বড় ধরনের পরাজয় বরণ করতে হতে পারে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সুধী সমাজ এখন যশোর জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। বিশেষ করে বিএনপির বলিষ্ঠ নেতা মরহুম তরিকুল ইসলামের পুত্র অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের কাছে তাদের দাবি, তিনি যেন দ্রুত এই বিষয়টি তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেন। সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, চাঁচড়াকে এই চাঁদাবাজ ও মাদকসেবীদের কবল থেকে মুক্ত করা হোক। তারা শান্তিতে বাস করতে চান এবং এই ভুঁইফোড় ‘মামা-ভাগ্নে পরিষদ’ থেকে মুক্তি চান। নয়তো ক্ষোভের এই আগুন আগামী নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে বলে স্থানীয়রা সতর্ক করেছেন।













