ভোলাহাট সীমান্তে বিজিবির বড় সাফল্য: আমবাগান থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নেশাজাতীয় সিরাপ জব্দ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট সীমান্ত এলাকা এখন চোরাচালান ও মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য এক আতঙ্কের জনপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি) তাদের নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে একের পর এক মাদকের চালান আটকে দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার ভোরে এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে সীমান্ত এলাকা থেকে ৮৪ বোতল ভারতীয় নেশাজাতীয় ‘Eskuf’ সিরাপ জব্দ করেছে বিজিবি সদস্যরা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো এই অভিযানে মাদক কারবারিরা পালিয়ে গেলেও মাদকের বড় একটি চালান উদ্ধার করতে সক্ষম হন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ বিজিবির এই তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়েছে।

বিজিবি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানটি পরিচালিত হয় গত ০৮ জুলাই ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ৩টা ৩০ মিনিটে। মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি)-এর অধীনস্থ চাঁনশিকারী বিওপিতে দায়িত্বরত নায়েক মো. আমজাদ আলীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ টহল দল এই অভিযানে অংশ নেয়। বিজিবি সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে ওত পেতে ছিলেন সীমান্ত পিলার ১৯৯/৪-এস থেকে প্রায় ৬০০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এলাকাটি ছিল ভোলাহাট উপজেলার ১ নম্বর ভোলাহাট ইউনিয়নের হাউজফুল গ্রাম। সেখানে জনৈক বুদ্ধ সুবেদারের একটি বড় আমবাগান রয়েছে, যা মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছিল। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা মালপত্র নিয়ে আসলেও বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

উদ্ধারকৃত মাদকের বর্ণনা দিয়ে বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে মাদকসেবীদের কাছে ফেন্সিডিলের বিকল্প হিসেবে ‘Eskuf’ সিরাপের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এটি মূলত একটি ভারতীয় কাশির সিরাপ হলেও এর মধ্যে থাকা রাসায়নিক উপাদান নেশার কাজে ব্যবহৃত হয়। উদ্ধারকৃত ৮৪ বোতল সিরাপের বাজারমূল্য কয়েক লক্ষ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিজিবি সদস্যদের মতে, সীমান্ত এলাকায় ১০০% কঠোর নজরদারি থাকার পরেও কিছু অসাধু ব্যক্তি অর্থের লোভে এই বিষাক্ত নেশা দেশে পাচার করার চেষ্টা করছে। তবে বিজিবি ২৪/৭ সজাগ থাকায় এই চালানটি যুবসমাজের হাতে পৌঁছানোর আগেই জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। বিজিবির এই সাহসিকতাপূর্ণ কাজ স্থানীয় তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করল বলে মনে করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

এই সফল অভিযানের বিষয়ে মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী (এসজিপি, বিএফএম, পিএসসি) গণমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান সবসময়ই ‘জিরো টলারেন্স’। আমরা চাই আমাদের দেশের যুবসমাজ এই মরণনেশা থেকে দূরে থাকুক। সীমান্ত দিয়ে এক ফোঁটা মাদকও যাতে দেশে ঢুকতে না পারে, তার জন্য বিজিবি সদস্যরা রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করে যাচ্ছে। এই সিরাপগুলো জব্দের ফলে মাদক ব্যবসায়ীদের বড় অংকের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা তাদের মনোবল ভেঙে দেবে।” অধিনায়ক আরও জানান, উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্য ধ্বংস করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল। স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার পর কিছু নির্জন আমবাগান মাদক কেনাবেচার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিজিবির এই অভিযানের ফলে ঐ এলাকার অপরাধীরা এখন গা ঢাকা দিয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, চোরাচালান প্রতিরোধে তাদের অভিযানে গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার বেড়েছে অন্তত ৪০% থেকে ৫০%। শুধু মাদক নয়, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং জাল টাকার সরবরাহ বন্ধেও বিজিবি কাজ করছে। জব্দকৃত সিরাপগুলো মূলত অবৈধ পথে ভারত থেকে আনা হয়েছিল। চোরাকারবারিরা যখন দেখল বিজিবি সদস্যরা তাদের একদম কাছে চলে এসেছে, তখন তারা বস্তাগুলো ফেলে দিয়ে বাগানের গহীনে আত্মগোপন করে। বিজিবি সদস্যরা অনেকক্ষণ সেখানে তল্লাশি চালালেও অন্ধকারের কারণে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে বাংলাদেশে মাদকের অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ড্রোন ও নাইট ভিশন ক্যামেরার মাধ্যমে দুর্গম এলাকাগুলোতে নজরদারি চালানো হচ্ছে। ভোলাহাটের এই অভিযানেও বিশেষ গোয়েন্দা তথ্যের বড় ভূমিকা ছিল। বিজিবি কর্মকর্তাদের মতে, মাদক ব্যবসায়ীরা এখন ভিন্ন ভিন্ন ছদ্মনাম ও কৌশলে মাদক পাচার করছে। ফেন্সিডিলের ওপর কড়াকড়ি বাড়ায় তারা এখন ‘Eskuf’ বা ‘Escuf’ নামক সিরাপগুলো নিয়ে আসছে। দেশের সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিজিবি যেভাবে জীবন বাজি রেখে কাজ করছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, শুধু মাদক জব্দ নয়, যারা এই চালানের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করেছে (গডফাদার), তাদেরও যেন আইনের আওতায় আনা হয়।

মাদকের এই অবৈধ কারবার বন্ধে বিজিবি ও পুলিশের পাশাপাশি জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। হাউজফুল গ্রামের সাধারণ কৃষকরা বলছেন, তাদের আমবাগানে যদি নিয়মিত পুলিশের টহল থাকে, তবে অপরাধীরা সাহস পাবে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে গত এক বছরে মাদক পাচার প্রায় ২৫% কমেছে। তবে চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত রুট পরিবর্তন করছে। আজকের ৮৪ বোতল সিরাপ জব্দ করা বিজিবির জন্য একটি ছোট জয় হতে পারে, কিন্তু এটি মাদক কারবারিদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিজিবির অধিনায়ক তাজুল ইসলাম চৌধুরী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে মাদকবিরোধী এই লড়াই অব্যাহত থাকবে।

পরিশেষে, ভোলাহাট সীমান্তের এই অভিযান প্রমাণ করে যে বিজিবি দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বদা প্রস্তুত। উদ্ধারকৃত ৮৪ বোতল নেশাজাতীয় সিরাপ ধ্বংসের মাধ্যমে সমাজ থেকে কিছুটা বিষ দূর হবে। মাদকের বিষাক্ত থাবা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পাশাপাশি গ্রামবাসী ও অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। কোনো অস্বাভাবিক তৎপরতা বা সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে সাথে সাথে বিজিবি বা স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো নাগরিক দায়িত্ব। বিজিবির এই ধরনের সফল অভিযান আগামী দিনেও মাদক সম্রাটদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভোলাহাটবাসীর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকে মাদকমুক্ত করতে প্রশাসন ও জনগণ এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ