ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় মাদকবিরোধী এক বিশেষ অভিযানে গাঁজা সেবনের সময় হাতেনাতে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। পরবর্তীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। গত ০৮/০৭/২০২৬ তারিখ বিকেলে উপজেলার বগুড়া ইউনিয়নের বারইহুদা গ্রামে এই অভিযান পরিচালিত হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম মোঃ মহাব্বত আলী (৪৫)। তিনি ওই গ্রামেরই মৃত সৈয়দ আলীর ছেলে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ এই সফল অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়।
ঘটনার দিন গোপন সূত্রে খবর আসে যে, বারইহুদা গ্রামের জনৈক নিয়ত আলীর কলা বাগানের ভেতর একদল লোক মাদক সেবনের জন্য জড়ো হয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে শৈলকুপা থানার একটি চৌকস দল দ্রুত সেখানে পৌঁছায়। পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত কৌশলে পুরো বাগানটি ঘিরে ফেলেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ২ থেকে ৩ জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও ঘটনাস্থল থেকে মহাব্বত আলীকে আটক করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে মাদক সেবনের সরঞ্জাম ও কিছু পরিমাণ গাঁজা উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, মহাব্বত আলী দীর্ঘদিন ধরেই মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত এবং তার বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে আরও নানা অভিযোগ রয়েছে। মাদক সেবনের ফলে এলাকায় ছোটখাটো চুরির ঘটনাও বেড়ে যাচ্ছিল বলে গ্রামবাসী দাবি করেন।
আটকের পরপরই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। ম্যাজিস্ট্রেট অভিযুক্ত ব্যক্তির জবানবন্দি গ্রহণ করেন এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(১) সারণির ২১ ধারা মোতাবেক মহাব্বত আলীকে গাঁজা সেবনের অপরাধে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। সাজা ঘোষণার পর পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে আদালতের মাধ্যমে ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ জানায়, মাদকের বিরুদ্ধে তাদের এই ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি ভবিষ্যতেও কঠোরভাবে বজায় থাকবে।
শৈলকুপা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই অভিযানে তাদের লক্ষ্য ছিল মাদকসেবীদের মধ্যে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছে দেওয়া। তিনি বলেন, “মাদক সমাজের ক্যান্সারের মতো। এটি একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের কাছে খবর ছিল যে বারইহুদা গ্রামের বাগানগুলোতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। আমরা ১০০% নিশ্চিত হয়েই অভিযানটি চালিয়েছি। এই ধরনের অভিযান আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে। যারা মাদক বিক্রি বা সেবনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।” পুলিশের এই সাহসী পদক্ষেপে এলাকার সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাদকসেবীদের কারণে সন্ধ্যা নামলেই বাগানের আশপাশে চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন পুলিশি তৎপরতা বাড়ায় অপরাধীরা ভয় পাবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী, মাদক সেবন ও বিক্রির শাস্তি আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর করা হয়েছে। বারইহুদার এই ঘটনায় প্রয়োগ করা ২১ ধারাটি মূলত ক্ষুদ্র মাদক সেবীদের জন্য প্রযোজ্য। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল জেল বা জরিমানা দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। পরিবারের প্রতিটি অভিভাবককে তাদের সন্তানদের ওপর কড়া নজর রাখতে হবে। কোনো যুবক বা ব্যক্তি যদি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তবে তাকে সময়মতো সংশোধন করার চেষ্টা করতে হবে। তবে অপরাধ করলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, যার প্রমাণ মহাব্বত আলীর এই সাজা। সরকারি হিসেবে মাদকাসক্তির হার প্রতি বছর ১০% থেকে ১৫% হারে বাড়ছে, যা দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি।
বগুড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জানান, তার ইউনিয়নে মাদকের কোনো স্থান নেই। তিনি পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে এই সফল অভিযানের জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “আমরা গ্রাম পর্যায়ে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করেছি। মহাব্বত আলীর মতো যারা সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট করছে, তাদের জন্য এই সাজা একটি বড় উদাহরণ। ভবিষ্যতে অন্য কেউ গাঁজা বা কোনো প্রকার মাদক সেবনের সাহস করবে না।” গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিয়ত আলীর এই কলা বাগানটি অনেক বড় হওয়ায় নির্জন পরিবেশের সুযোগ নিয়ে মাদকসেবীরা সেখানে আস্তানা গেড়েছিল। এখন থেকে স্থানীয়রা নিয়মিত বাগানটি তদারকি করবেন এবং কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখলে সরাসরি পুলিশকে ১০০ নম্বরে ফোন করে জানাবেন।
শৈলকুপা উপজেলা প্রশাসন মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদানের ফলে অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হচ্ছে। ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও মাদক নির্মূলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বলছে, শুধু আটক নয়, মাদক সরবরাহের রুটগুলোও বন্ধ করার কাজ চলছে। বারইহুদা গ্রামের এই ঘটনাটি সেই সামগ্রিক অভিযানেরই একটি অংশ মাত্র। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, তথ্য প্রদানকারীর নাম সবসময় গোপন রাখা হবে যাতে তারা নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন। মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ জয় করতে হলে পুলিশ, প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, মহাব্বত আলীর ৩ মাসের কারাদণ্ড কেবল একজন ব্যক্তির সাজা নয়, এটি মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর অবস্থানকে তুলে ধরে। ঝিনাইদহের শৈলকুপার মতো মফস্বল শহরগুলোতেও এখন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিখুঁত অভিযান চালানো হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাজ থেকে এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব। আগামী দিনে শৈলকুপার প্রতিটি গ্রাম মাদকহীন এবং নিরাপদ হবে বলে আশা করছে সাধারণ মানুষ। পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাদকের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসুক পথভ্রষ্ট যুব সমাজ।













