শৈলকুপায় মানবতার সেবায় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প: বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য বুধবার দিনটি ছিল একটু অন্যরকম। অভাব আর অনটনের কারণে যারা নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে পারেন না, তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল উন্নত চিকিৎসাসেবা। শৈলকুপার ৬নং সারুটিয়া ইউনিয়নের কাটলাগাড়ী ডিগ্রি কলেজে আয়োজিত এই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে যেন উপচে পড়া ভিড় ছিল সাধারণ মানুষের। ‘মানবতার সেবায়’ এই মহতী স্লোগানকে সামনে রেখে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে দিনভর বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ প্রদান করা হয়।

সকাল থেকেই কাটলাগাড়ী কলেজ প্রাঙ্গণে গ্রামগঞ্জ থেকে আসা মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ক্যাম্পের প্রতিটি বুথে রোগীদের লাইন দীর্ঘ হতে থাকে। আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, এবারের ক্যাম্পে প্রায় ৩০০ জনেরও বেশি রোগী সরাসরি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়েছেন। বর্তমান বাজারে ওষুধের দাম ও ডাক্তারের ভিজিট যেখানে সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে, সেখানে এমন আয়োজন এলাকার নিম্নআয়ের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই মানবিক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মো. রাশেদ আল মামুন। তিনি ফিতা কেটে ক্যাম্পের সূচনা করার পর এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, “আমাদের দেশের প্রায় ৭০% মানুষ গ্রামে বাস করেন। তাদের অনেকেরই সামর্থ্য নেই শহরে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখানোর। গ্রামীণ এই জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এ ধরণের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।” তিনি আরও বলেন, সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিত্তবান ও সামাজিক সংগঠনগুলো যদি এভাবে এগিয়ে আসে, তবে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান ১০০% নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এবারের ক্যাম্পে একঝাঁক অভিজ্ঞ চিকিৎসক রোগীদের সেবা প্রদান করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ডাক্তার শাহনাজ ইবনে কাশেম, ডাক্তার রাবেয়া খাতুন, ডঃ মুক্তাদির আল বাশার, ডাক্তার বাপ্পা ঘোষ এবং ডাক্তার জান্নাতুল ফেরদৌস তাপসী। চিকিৎসকরা মেডিসিন, গাইনি, শিশু স্বাস্থ্য এবং দন্ত চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রোগীদের সময় নিয়ে দেখেন। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক জানান, ক্যাম্পে আসা রোগীদের মধ্যে প্রায় ৬০% নারী এবং ৩০% শিশু ছিল সাধারণ অপুষ্টি ও চর্মরোগের সমস্যায় আক্রান্ত। চিকিৎসকরা কেবল তাদের ব্যবস্থাপত্রই দেননি, বরং কীভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থেকে রোগমুক্ত থাকা যায়, সে বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন।

ক্যাম্পে চিকিৎসা নিতে আসা ৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, “বাবার টাকা নাই বইলা অনেকদিন ধইরা গাও-হাত পা ব্যথার লাইগা ডাক্তার দেহাইতে পারি না। আজিনে আমাগো বাড়ির কাছেই ডাক্তার আইছে, তারা খুব আদর কইরা দেইখা কাগজ দিছে। দোয়া করি তারা যেন আমাগো মতো গরিবের পাশে থাকে।” স্থানীয় সূত্র জানায়, এই পুরো ক্যাম্পটি পরিচালনা করতে প্রায় ৫০০ ডলার সমমূল্যের প্রাথমিক ঔষধ ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা করেছিলেন আয়োজকরা। তাদের লক্ষ্য ছিল একজন রোগীও যেন পরামর্শ না নিয়ে ফিরে না যান।

আয়োজক কমিটির প্রতিনিধিরা জানান, এলাকার অসহায় মানুষের কথা চিন্তা করেই তারা এই ক্ষুদ্র প্রয়াস হাতে নিয়েছেন। তারা মনে করেন, সুস্থ জাতি গড়তে হলে প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সবার আগে জরুরি। অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সমাজসেবক এবং সংবাদকর্মীরা উপস্থিত থেকে চিকিৎসকদের উৎসাহিত করেন। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, কেবল একদিনের জন্য নয় বরং প্রতি মাসে অন্তত একবার করে এমন ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করা হোক।

বিকেল গড়িয়ে যখন ক্যাম্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়, তখন চিকিৎসকদের চেহারায় ক্লান্তির বদলে ছিল প্রশান্তি। আয়োজকরা জানিয়েছেন, আগামীতে তারা আরও বড় পরিসরে এই ধরণের সেবা চালু রাখার চেষ্টা করবেন। শৈলকুপার কাটলাগাড়ী ডিগ্রি কলেজের এই উদ্যোগটি কেবল একটি অনুষ্ঠান ছিল না, বরং এটি ছিল মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সমাজসেবার যে উদ্দীপনা এই ক্যাম্পের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে এই জনপদের স্বাস্থ্য খাতের চিত্র বদলে দিতে সহায়ক হবে বলে বিশ্বাস করেন স্থানীয় সুধীসমাজ।

সম্পর্কিত নিবন্ধ