ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আঙিনায় ঝকঝকে আধুনিক এক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট দাঁড়িয়ে আছে। তবে দূর থেকে একে যত আধুনিক মনে হয়, কাছে গেলে দেখা যায় এক করুণ চিত্র। সরকারি কয়েক লাখ টাকা খরচ করে নির্মিত এই প্ল্যান্টটি উদ্বোধনের পর থেকেই কার্যত অচল। বর্তমানে এটি কোনো কাজে তো আসছেই না, উল্টো হাসপাতালের সংক্রামক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এলাকাবাসী। নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার না হওয়ায় এবং এই প্ল্যান্টটি ব্যবহার না করায় হাসপাতালের ভেতর ও আশপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। এতে রোগী, স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রায় ৮০% বেড়ে গেছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্ল্যান্টটির গায়ে ধুলোবালির পুরু আস্তরণ জমেছে। যে যন্ত্রটির মাধ্যমে হাসপাতালের বিষাক্ত সিরিঞ্জ, ব্যবহৃত ব্যান্ডেজ, রক্তমাখা তুলা এবং স্যালাইনের বোতল ধ্বংস করার কথা ছিল, তা এখন কেবল লোহার স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন এই কমপ্লেক্সে শত শত রোগী সেবা নিতে আসেন। এদের চিকিৎসা শেষে দৈনিক প্রায় ১৫ থেকে ২০ কেজি বিপজ্জনক চিকিৎসা বর্জ্য তৈরি হয়। নিয়ম অনুযায়ী এসব বর্জ্য উচ্চতাপে পুড়িয়ে বা বিশেষ পদ্ধতিতে ধ্বংস করার কথা থাকলেও প্ল্যান্ট অচল থাকায় সেসব এখন হাসপাতালের পেছনের খোলা জায়গায় কিংবা যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বৃষ্টির সময় এই বর্জ্য ধুয়ে পাশের জলাশয়ে মিশে যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ১০০% হুমকি স্বরূপ।
শৈলকুপা বাজারের এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার মানুষের উপকারের জন্য এতো টাকা খরচ করে প্ল্যান্ট বানালো, কিন্তু সেটি এখন জঞ্জাল হয়ে পড়ে আছে। হাসপাতালের পেছনের ড্রেন দিয়ে যখন বর্জ্য মিশ্রিত পানি প্রবাহিত হয়, তখন দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে আমরা বেশি দুশ্চিন্তায় থাকি। কারণ এসব বর্জ্যের সংস্পর্শে এলে হেপাটাইটিস বি, সি কিংবা চর্মরোগের মতো ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে প্রায় ৯০ ভাগ। অথচ এই আধুনিক প্ল্যান্টটি সচল থাকলে এই সমস্যার সমাধান অনেক আগেই সম্ভব হতো।
এই বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. রাশেদ আল মামুন বাস্তব সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, প্ল্যান্টটি পরিচালনার জন্য যে ধরণের কারিগরি জ্ঞান ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল প্রয়োজন, তার অভাব রয়েছে। এছাড়া জনবল সংকটের কারণেও এই কার্যক্রম নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানিয়েছি। সরকারের অন্তত ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো সচল করতে হলে দক্ষ অপারেটর প্রয়োজন। জনবল পাওয়া গেলে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ শেষ করতে পারলে আমরা দ্রুতই এটি চালু করতে পারব।” তবে কবে নাগাদ এই সমস্যার সমাধান হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে সরকার প্রতি বছর বাজেটের একটি বড় অংশ বরাদ্দ দেয়। তবে শৈলকুপার মতো অনেক জায়গাতেই দেখা যায়, অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবলের অভাবে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। শৈলকুপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই প্ল্যান্টটি চালু না হওয়ায় কেবল রাষ্ট্রের আর্থিক অপচয় হচ্ছে না, বরং প্রতিদিন বিপন্ন হচ্ছে হাজারো মানুষের জীবন। বিশেষ করে বর্তমানে ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা বর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, অন্তত ৫ জন দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিলে এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কেবল চিঠি চালাচালি করে সময় ক্ষেপণ না করে স্বাস্থ্য বিভাগকে দ্রুত তদন্তে নামতে হবে। কেন এতোদিন ধরে এই প্ল্যান্টটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে এবং কার গাফিলতিতে সরকারের কয়েক হাজার ডলার সমমূল্যের অর্থ বিফলে যাচ্ছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। একই সঙ্গে তারা হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জাতীয় নীতিমালা পুরোপুরি অনুসরণ করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সেবাকেন্দ্রের বদলে রোগ ছড়ানোর ভাগাড়ে পরিণত হতে পারে।
শৈলকুপার এই চিত্র পুরো দেশের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় কেনা আধুনিক যন্ত্রপাতি এভাবে নষ্ট হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এলাকার মানুষ আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ঘুম থেকে জাগবেন এবং অচল এই প্ল্যান্টটি চালু করে তাদের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্তি দেবেন। অন্যথায়, এই বিষাক্ত বর্জ্যের প্রভাবে অদূর ভবিষ্যতে এই জনপদ বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।













