শৈলকুপায় আশ্রয়ন কেন্দ্রে গাঁজা সেবন: চারজনের ৩ মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে এবং যুবসমাজকে বিপথগামী হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে দেশজুড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলাও এর বাইরে নয়। এই উপজেলার সাধারণ মানুষকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় পুলিশ বেশ কিছুদিন ধরে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ জুলাই সোমবার শৈলকুপা থানা পুলিশ একটি সাহসী অভিযান চালিয়েছে। উপজেলার ২নং মির্জাপুর ইউনিয়নের একটি সরকারি আশ্রয়ন কেন্দ্রের ভেতর থেকে গাঁজা সেবনরত অবস্থায় চারজন চিহ্নিত মাদকসেবীকে হাতেনাতে আটক করা হয়। আটকের পর মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রদান করা হয়েছে।

আটককৃত এই চার মাদকসেবীর পুরো পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এরা হলো মির্জাপুর গ্রামের আক্কাস আলী মুন্সীর ছেলে মো. সাগর হোসেন, রাজনগর গ্রামের মৃত রহমত আলী মোল্যার ছেলে মো. জনি হোসেন, বড়দাহ গ্রামের মৃত আকমল হোসেনের ছেলে মো. বিপুল হোসেন এবং মহম্মদপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেকের ছেলে মো. চন্দন কাজী। এই চারজনের বাড়িই শৈলকুপা থানার অন্তর্গত বিভিন্ন গ্রামে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন হলেন একজন সম্মানিত বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান যখন এমন জঘন্য নেশার সাথে যুক্ত হন, তখন সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের করুণ চিত্রটি খুব সহজেই সবার সামনে ফুটে ওঠে। এই তরুণরা টাকার লোভে ও খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে জড়িয়ে পড়েছে এই মরণনেশায়।

ঘটনার দিন পুলিশের কাছে একটি অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ আসে। পুলিশ জানতে পারে যে, ২নং মির্জাপুর ইউনিয়নের সরকারি আশ্রয়ন কেন্দ্রের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় কয়েকজন যুবক প্রকাশ্যে গাঁজা সেবন করছে এবং সেখানে মাদকের আসর বসিয়েছে। আশ্রয়ন কেন্দ্রগুলো মূলত গৃহহীন ও অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে সরকার তৈরি করে দিয়েছে। কিন্তু অপরাধীরা এই জায়গাগুলোকে নিজেদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছিল। খবর পাওয়ার পরপরই শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল ওই এলাকায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অভিযান চালায়। পুলিশ সরাসরি আশ্রয়ন কেন্দ্রে হানা দেয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই যুবকরা ঘাবড়ে যায় এবং পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সতর্ক পুলিশ সদস্যরা চারপাশ ঘিরে ফেলে তাদের চারজনকেই হাতেনাতে ধরে ফেলেন।

আটকের পরপরই ঘটনাস্থলে শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিজে উপস্থিত হয়ে একটি মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। আটককৃত চারজন যুবক নিজেদের অপরাধ স্বীকার করায় এবং হাতেনাতে গাঁজা সেবনের প্রমাণ মেলায়, ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের সরাসরি সাজা প্রদান করেন। ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(১) সারণির ২১ ধারা মোতাবেক গাঁজা সেবন ও রাখার অপরাধে তাদের প্রত্যেককে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়। সাধারণত দীর্ঘ মেয়াদি আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যায়, কিন্তু মোবাইল কোর্টের এই তাৎক্ষণিক সাজার ফলে অপরাধীদের মনে এখন বেশ ভয় ঢুকেছে। তাদের সরাসরি ৩ মাসের সাজা দেওয়ায় আশ্রয়ন কেন্দ্রের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় অভিভাবকদের মনে গভীর স্বস্তি ফিরে এসেছে।

বর্তমানে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক প্রবেশ করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা চুরি, ছিনতাই, মারামারি বা কিশোর অপরাধের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনার পেছনেই এই মাদকের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তরুণরা একবার গাঁজা বা ইয়াবার মতো ভয়ংকর নেশায় জড়ালে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। মাদক কারবারিরা মূলত নিজেদের পকেট ভারী করতে এই সমাজকে ধ্বংস করছে। এই মাদক বিক্রির মাধ্যমে তারা হয়তো দৈনিক ৫বা১০(ডলার) লাভ করে, কিন্তু এর বিনিময়ে তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে এলাকার অসংখ্য তরুণের ভবিষ্যৎ। গ্রামের খেটে খাওয়া পরিবারের সন্তানেরা অনেক সময় কৌতূহলবশত বা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এসব মাদক সেবন শুরু করে এবং একসময় পুরোপুরি আসক্ত হয়ে পড়ে।

মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সচ্ছল পরিবারও আজ আর্থিকভাবে পথে বসছে। একজন মাদকাসক্ত সন্তানকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পুনর্বাসন কেন্দ্রে বা রিহ্যাবে পাঠাতে একটি পরিবারকে অনেক সময় ৫০০থেকে১০০০ডলার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো বিশাল অঙ্ক খরচ করতে হয়। গ্রামের সাধারণ কৃষক, দিনমজুর বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ মেটানো ১০০% অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে চরম হতাশা ও কান্নার মধ্যে দিন পার করে।

সরকারি আশ্রয়ন কেন্দ্রের মতো একটি পবিত্র জায়গায় এমন মাদকের আখড়া গড়ে ওঠায় স্থানীয় সাধারণ মানুষ এতদিন চরম আতঙ্কে দিন পার করছিলেন। কারণ, সেখানকার কোমলমতি শিশুরা খুব সহজেই এই মাদকসেবীদের দেখে বিপথগামী হতে পারে। আজ এই চার মাদকসেবী প্রশাসন ও পুলিশের হাতে আটক হয়ে জেলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রশাসনকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি করেছেন, এই ধরনের ঝটিকা অভিযান যেন শুধু একদিনের জন্য না হয়, বরং সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলে। শৈলকুপাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।

সম্পর্কিত নিবন্ধ