রাজধানী ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায় অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং মর্মান্তিক এক ঘটনা ঘটেছে। মাত্র দুই বছর বয়সী এক ফুটফুটে অবুঝ শিশুকে পাশবিক ও যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই বয়সে একটি শিশু ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না, আর সেই শিশুর ওপর এমন নির্মম নির্যাতন সমাজের সাধারণ মানুষকে রীতিমতো স্তব্ধ করে দিয়েছে। গুরুতর ও রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা শিশুটির জীবন বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর পুরো এলাকায় চরম ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
শিশুটির মামা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে সাংবাদিকদের কাছে এই ভয়ংকর ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি জানান, শিশুটির মা পেশায় একজন গৃহকর্মী। প্রতিদিনের মতো সোমবার দুপুরেও তিনি তার দুই বছরের শিশুসন্তানকে নিজেদের ভাড়াবাসায় ঘুম পাড়িয়ে রেখে পাশের একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে গিয়েছিলেন। গরিব মানুষ হওয়ায় সন্তানকে দেখার জন্য আলাদা কাউকে রাখার সামর্থ্য তাদের নেই। প্রায় দুই ঘণ্টা কাজ শেষে যখন তিনি বাসায় ফিরে আসেন, তখন তার চোখের সামনে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য ভেসে ওঠে। তিনি দেখেন, তার আদরের সন্তান বিছানায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে এবং ব্যথায় কাতরাচ্ছে।
সন্তানের এমন ভয়াবহ অবস্থা দেখে মা চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন এবং আশপাশের মানুষের সাহায্যে তাকে দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় স্থানীয় চিকিৎসকরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি। তারা শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর সোমবার বিকেলের দিকে শিশুটিকে ঢামেক হাসপাতালের গাইনি বিভাগে নিয়ে এসে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটি চরম শারীরিক ও মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছে এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এই ঘটনার পেছনে ঠিক কে বা কারা জড়িত, তা নিয়ে পুলিশ ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ সূত্র থেকে জানা যায়, ঘটনার সময় শিশুটি যখন ঘরে একা ঘুমাচ্ছিল, তখন পাশের কক্ষে থাকা ১০ বছর বয়সী এক শিশু কিছু সময়ের জন্য ওই শিশুকে কোলে নিয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এরপরই মূলত শিশুটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং নির্যাতনের এই গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ১০ বছরের একটি শিশু কীভাবে এমন পাশবিক কাজ করতে পারে, তা নিয়ে পুলিশ ও এলাকাবাসী বেশ সন্দিহান। পুলিশের ধারণা, এর পেছনে অন্য কোনো প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীও জড়িত থাকতে পারে, যে হয়তো ১০ বছরের ওই শিশুটির নাম ব্যবহার করে পার পাওয়ার চেষ্টা করছে।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণখান থানার পরিদর্শক মিন্টু চন্দ্র রায় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা এমন একটি ভয়ংকর অভিযোগ পাওয়ার পরপরই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গেছেন। পুলিশ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ (যদি থাকে) এবং আশপাশের মানুষের সাথে কথা বলে পুরো বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে দেখছে।” তিনি সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেন, এই ঘৃণ্য অপরাধের সাথে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, পুলিশ তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করবে।
বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আশরাফী ইয়াসমিন শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্বে আছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, “আমরা শিশুটিকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছি এবং রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেছি। শিশুটির বয়স মাত্র দুই বছর, তাই সে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলে আমরা তাকে হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) পাঠাব।” তিনি আরও জানান, ওসিসিতে পাঠানোর পর শিশুটির ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। সেই পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেলেই কেবল আঘাতের প্রকৃতি এবং ঠিক কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, সে সম্পর্কে ১০০% নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আমাদের সমাজে শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ দিন দিন বেড়েই চলেছে। একটি বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর শত শত শিশু এমন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। অনেক সময় গরিব ও অসহায় পরিবারগুলো লোকলজ্জার ভয়ে বা আইনি খরচের ভয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চায় না। অপরাধীরা এই সুযোগটাই কাজে লাগায়। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ ধরনের অপরাধীদের জন্য আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়। শিশুটির পরিবার এখন শুধু তাদের সন্তানের সুস্থতা এবং অপরাধীর কঠোর শাস্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।













