যুবদলের জরুরি সভায় নেতাদের মধ্যে চরম হট্টগোল, প্রকাশ্যে এল ভেতরের কোন্দল

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম প্রধান সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল। মাত্র এক মাস আগে গত ৪ জুন যুবদলের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই কমিটি ঘোষণার এক মাস পার হতে না হতেই নেতৃত্বের ভেতরকার চাপা অস্বস্তি ও কোন্দল এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। সারা দেশে সাংগঠনিক সপ্তাহ পালন শেষে গতকাল রোববার রাজধানীর নয়াপল্টনে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটি জরুরি পর্যালোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। আর সেই সভাতেই নেতাদের মধ্যে চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যদিও সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ্যে এমন কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কথা স্বীকার করতে চাইছেন না।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, যুবদলের এই জরুরি সভায় বিতর্কের সূত্রপাত হয় মূলত কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ফিরোজ আবদুল্লাহকে ঘিরে। তবে ঠিক কী কারণে পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে নেতাদের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া গেছে। একটি সূত্রের দাবি, ফিরোজ আবদুল্লাহকে যুবদলের ফরিদপুর বিভাগের সাংগঠনিক টিমের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোববারের সভায় তিনি নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে সংগঠনের ঢাকা বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে অযাচিতভাবে মতামত প্রকাশ করতে শুরু করেন। অন্য বিভাগের নেতার এমন অনধিকার চর্চায় উপস্থিত অনেক নেতা বিরক্ত হন এবং তখনই বিতর্কের শুরু হয়।

অন্য একটি সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, ফিরোজ আবদুল্লাহর এমন মন্তব্যের পর কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম (নয়ন) তাকে থামানোর চেষ্টা করেন। তিনি ফিরোজকে সতর্ক করে বলেন, “তুমি তো সভাপতির স্বাক্ষরে সহসভাপতি হয়েছ, তাই ঠিকঠাকমতো চলবে।” সাধারণ সম্পাদকের এমন কড়া মন্তব্যে ভীষণ বিব্রত ও অপমানিত বোধ করেন ফিরোজ। তিনি আর কোনো কথা না বলে রাগে সভাকক্ষ থেকে দ্রুত বেরিয়ে যান। এরপর সভার পরিবেশ আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। তখন যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম (মুন্না) হঠাৎ করে তিনজন নেতার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই তিনজন হলেন যুবদলের সহসভাপতি কামরুজ্জামান, শামসুজ্জোহা ও মনিরুল ইসলাম। বিগত সময়ে দলের দুঃসময়ে সংগঠনে তাঁদের আসল ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে সভায় প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন সভাপতি। মজার ব্যাপার হলো, এই তিনজনকে যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ লোক বলে মনে করা হয়। ফলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীদের মধ্যে সভার পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

তবে যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম এই হট্টগোলের বিষয়টি কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “একটি বড় রাজনৈতিক দলের বৈঠকে সাংগঠনিক বিষয়ে নেতাদের মধ্যে মতানৈক্য বা তর্ক-বিতর্ক হতেই পারে। এটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউই শালীনতার বাইরে গিয়ে কোনো কথা বলেননি বা ন্যূনতম লিমিট ক্রস করেননি।”

শুধু ফিরোজ আবদুল্লাহর ঘটনাই নয়, সাম্প্রতিক সাংগঠনিক সফর নিয়েও রোববারের সভায় ব্যাপক ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে বলে জানা গেছে। যুবদলের তিন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ফেরদৌস, মাহমুদুস সালেহীন ও জিয়াউর রহমান সম্প্রতি কক্সবাজারে সাংগঠনিক সফরে গিয়েছিলেন। রোববারের সভায় মাহমুদুস সালেহীন ও জিয়াউর রহমান সরাসরি অভিযোগ করেন যে, কক্সবাজার সফরে স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে তাঁদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়নি। এ সময় উপস্থিত কয়েকজন নেতা পাল্টা প্রশ্ন তোলেন যে, নতুন কমিটিতে এমন অনেক ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাঁদের উল্লেখ করার মতো কোনো রাজনৈতিক অতীত অবস্থান বা পরিচিতি নেই। অভিযোগ ওঠে যে, এমন অপরিচিত নেতার সংখ্যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জনের মতো। দলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণেই তারা পদ পেয়েছেন বলেও সভায় জোরালো অভিযোগ ওঠে। অনেক নেতার মতেই, এই স্বজনপ্রীতির কারণেই আজ দলে এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

রোববারের এই উত্তপ্ত সভার বিষয়ে যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে প্রথম আলোকে বলেন, “সভায় বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা হয়েছে। অনেকেই নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে ব্যক্ত করেছেন। একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনের সভায় এ ধরনের কথাবার্তা হওয়া ১০০% স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু মিডিয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুবদল সম্পর্কে সিন্ডিকেট নিউজ করেছে। আমি খুব অবাক হয়েছি যে, তারা নিউজ করার আগে আমি বা সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কোনো কথাই বলল না। অথচ তাদের কাছে কোনো রেকর্ড বা ফুটেজও নেই।” তিনি দাবি করেন, দলের ভেতর কোনো বড় ধরনের ফাটল বা কোন্দল নেই।

এদিকে আজ সোমবার বিকেল থেকে নয়াপল্টন কার্যালয়ে যুবদলের রোববারের সেই মুলতবি সভা আবার নতুন করে শুরু হয়। সেই সভা চলাকালীন ভিডিও কলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন যুবদল সভাপতি আবদুল মোনায়েম। তিনি নিজের মুঠোফোনের ক্যামেরায় নিজ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের দেখিয়ে বলেন, তারা অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সভা করছেন এবং তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ বা দ্বন্দ্ব নেই। উল্লেখ্য, গত ২৩ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত যুবদলের একটি সাংগঠনিক সপ্তাহ পালন করা হয়। এ সময়ে সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নেতৃত্বে ১০টি টিম দেশের ১০টি সাংগঠনিক বিভাগ সফর করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। সেই কর্মসূচির ভালো-মন্দ মূল্যায়ন করতেই মূলত রোববার এই জরুরি পর্যালোচনা সভায় বসেছিলেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

সম্পর্কিত নিবন্ধ