সাভারে এনসিপির জুলাই পদযাত্রার সমাবেশে ককটেল হামলা, নাহিদ ইসলাম বললেন ‘প্রশাসনের সহায়তায়’

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঢাকার সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির সমাবেশে এক আকস্মিক ও ভয়ংকর বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার রাত পৌনে ১০টার দিকে সাভারের তারাপুর ঈদগাহ মাঠ এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দলটির আহ্বায়ক এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। এই ককটেল হামলায় অন্তত চারজন সাধারণ মানুষ ও নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। এনসিপির শীর্ষ নেতারা অত্যন্ত জোরালোভাবে অভিযোগ করেছেন যে, স্থানীয় প্রশাসনের সরাসরি সহায়তায় এবং রাজনৈতিক ইন্ধনে তাদের এই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে ককটেল হামলা করা হয়েছে।

বিস্ফোরণে আহত চার ব্যক্তির পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। তারা হলেন মো. শাহীন খন্দকার (৩০), মো. জসিম (২৬), মো. শাহাদাত হোসেন (৪০) এবং ইমরান হোসেন। বিস্ফোরণের পরপরই তাদের উদ্ধার করে দ্রুত সাভারের বেসরকারি এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক হাসান জানান, “আমরা চারজন রোগী পেয়েছি। এর মধ্যে একজনের পায়ের আঘাত কিছুটা গুরুতর ছিল। তিনজনকে জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অপারেশন থিয়েটারে (ওটিতে) পাঠানো হয়েছে। রোগীরা নিজেরাই জানিয়েছেন যে তারা বোমা বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন।” এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে পরে সাভার মডেল থানার সামনে বিক্ষোভ করেছেন এনসিপির ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা।

এনসিপির নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে জানা যায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সীমান্ত হত্যা পুরোপুরি বন্ধ এবং একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। সোমবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে সাভার থানা বাসস্ট্যান্ডে জড়ো হন দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। পরে সেখান থেকে তাঁরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পদযাত্রা শুরু করেন। পদযাত্রাটি প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে তারাপুর ঈদগাহ মাঠে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে এনসিপির ঢাকা জেলা উত্তরের আহ্বায়ক নাবিলা তাসনিদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন নাহিদ ইসলাম। এ ছাড়া জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক জাহিদ আহসানও সেখানে বক্তব্য দেন। রাত পৌনে ১০টার দিকে নাবিলা তাসনিদের বক্তব্য চলাকালেই হঠাৎ মঞ্চের সামনের দিকে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যা উপস্থিত সবাইকে আতঙ্কিত করে তোলে।

এই হামলার পর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, “প্রশাসন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০০% ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের এর জবাব দিতেই হবে। আপনারা ককটেল ফোটান, গুলি চালান, বোমাবাজি করুন—এনসিপির এই জুলাই পদযাত্রা কোনোভাবেই থামবে না। সারা বাংলাদেশের আনাচকানাচে প্রতিটি উপজেলায় আমরা আমাদের এই পদযাত্রা নিয়ে যাব। স্থানীয় এমপি (সংসদ সদস্য) আসলে কী করেন? তিনি কি এই এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছেন? আজকে আমাদের এখান থেকে অনেক লোক গুরুতর আহত হয়েছেন। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”

সমাবেশের শুরুতে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম প্রশাসনের দিকে আঙুল তোলেন। তিনি বলেন, “কেন ঠিক ওই সময়েই বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল? এটা একদম স্পষ্ট যে আজকে আমাদেরকে খুন করার মাস্টারপ্ল্যানেই এখানে বোমা বিস্ফোরণ করা হয়েছে। এই ককটেল বিস্ফোরণ সরাসরি প্রশাসনের সহায়তায় হয়েছে।” তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসীদের ঠিকানা এই সাভারে হবে না। যারা এই ককটেল হামলাকারীদের এবং বোমাবাজ খুনিদের প্রশ্রয় দেবে, তাদের পরিণতি বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতোই হবে।

তাঁর এই কড়া বক্তব্যের পর নেতা-কর্মীরা একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সাভার মডেল থানার সামনে অবস্থান নেন। নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতা থানার ভেতরে গিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। পরে সাংবাদিকদের নাহিদ ইসলাম বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঘটা মানেই পুলিশের চরম ব্যর্থতা। আমরা মনে করছি, এখানে গভীর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। পুলিশকে যদি দলীয়করণ করা হয়, তবে তারা এ ধরনের ঘটনায় আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। পুলিশ বলছে, তাদের ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। এখন তারা অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে পারছে কি না, এটার ওপরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে তারা নিরপেক্ষ কি না।”

এই ঘটনার পর ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, এনসিপির সমাবেশে বক্তৃতা চলাকালে বিস্ফোরণের ঘটনাটি খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা এনসিপি নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের সাভার থানায় পৌঁছে দিয়েছেন। সেখানে তারা এই ঘটনায় এজাহার দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশ সুপার আশ্বস্ত করেন যে, মামলা হলে ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার বিষয়টিও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এর আগে সোমবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে গাজীপুরে কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ এলাকা থেকে এই জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। সেখানে নাহিদ ইসলাম বর্তমান সরকারের কড়া সমালোচনা করে বলেছিলেন, “ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে একটি নির্বাচন হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের ৭০% মানুষ সংস্কারের পক্ষে বা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার সেই গণভোট এবং জুলাই সনদকে এখন অস্বীকার করছে। তারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করছে।”

সম্পর্কিত নিবন্ধ