যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ ‘ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন বাংলাদেশি গবেষক সুমাইয়া সমাজী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বিদেশের মাটিতে আবারও বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করলেন এক কৃতি সন্তান। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছেন বাংলাদেশি তরুণ গবেষক সুমাইয়া সমাজী। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের (কেইউ) ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তার এই অসামান্য অর্জনে দেশে থাকা পরিবার, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝে বইছে আনন্দের বন্যা।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফেডারেশন (এনএসএফ) প্রতি বছর তাদের দেশের সবচেয়ে মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ গবেষকদের এই ‘ক্যারিয়ার’ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে থাকে। অ্যাকাডেমিক জগতে তরুণদের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ ও সম্মানজনক একটি পুরস্কার। এই পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে সুমাইয়া সমাজী শুধু সম্মানই পাননি, বরং আগামী পাঁচ বছর তার নিজের পছন্দমতো বিষয় নিয়ে গবেষণা করার জন্য এনএসএফের কাছ থেকে প্রায় ৫ লাখ ডলার ($৫০০,০০০) অনুদান পাবেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার ওপরে, যা তার গবেষণার কাজকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

সুমাইয়া সমাজীর এই সফলতার পেছনে রয়েছে তার পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিক্ষার পরিবেশ। তার বাবা এহসানুল হক সমাজী বাংলাদেশের আইন অঙ্গনের একজন অত্যন্ত পরিচিত ও খ্যাতিমান আইনজীবী। সুপ্রিম কোর্টের এই সিনিয়র আইনজীবী তার দীর্ঘ ও সফল কর্মজীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইউএনডিপি-বাংলাদেশের ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রসিকিউটোরিয়াল উপদেষ্টা, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে সুনামের সাথে কাজ করেছেন। বাবার এমন বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার সুমাইয়াকে ছোটবেলা থেকেই বড় কিছু করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

সুমাইয়া সমাজীর বর্তমান গবেষণার মূল বিষয়বস্তু হলো ‘সরবরাহব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইনের নিরাপত্তা’। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে কম্পিউটার চিপ, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলো কারখানা থেকে বের হয়ে অনেক হাত ঘুরে সাধারণ গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়। এই পুরো সরবরাহব্যবস্থাটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় অনেক অসাধু চক্র এর সুযোগ নেয়। ফলে পণ্যগুলোর আসল উৎস কী এবং সেগুলো ১০০% আসল কি না, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নকল পণ্য শুধু মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিই তৈরি করে না, এটি অনেক সময় জননিরাপত্তা ও একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

সুমাইয়া মূলত এই সমস্যার একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিগত সমাধান খুঁজছেন। তার গবেষণার প্রধান লক্ষ্য হলো, এমন একটি নিরাপদ ও উন্নত ডিজিটাল-ব্যবস্থা বা সিস্টেম তৈরি করা, যার মাধ্যমে খুব সহজেই যেকোনো পণ্য ও ব্যক্তির আসল পরিচয় বা সত্যতা যাচাই করা যাবে। এই নতুন প্রযুক্তি বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিকে দ্রুত নকল পণ্য শনাক্ত করতে সাহায্য করবে। এর ফলে বিশ্বের বড় সরবরাহব্যবস্থা এবং উচ্চ নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়, এমন স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে সাধারণ মানুষ ও ভোক্তাদের আস্থা অনেক গুণ বাড়বে। তার এই গবেষণা সফল হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নকল পণ্যের কারণে হওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ($) ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

সুমাইয়া সমাজীর সঙ্গে এবার কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও দুই মেধাবী সহকারী অধ্যাপক এই মর্যাদাপূর্ণ ‘ক্যারিয়ার’ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। তাদের মধ্যে কেমিক্যাল অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আনা মোরাইস এমন এক ধরনের প্লাস্টিক (পলিপ্রোপাইলিন) নিয়ে কাজ করছেন, যা সহজে রিসাইকেল বা পুনরায় ব্যবহার করা যায় না। অন্যদিকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক জিজুন ইয়াও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের (AI) নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস বিশ্ববিদ্যালয় সব সময়ই গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মোট ২০ জন সহকারী অধ্যাপকের মধ্যে ১১ জনই তাদের ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময় এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছেন। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, সুমাইয়া সমাজী কতটা প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নত পরিবেশে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। তার এই অর্জন আগামী দিনে আরও অনেক বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীকে বিদেশে গিয়ে বড় বড় গবেষণায় যুক্ত হতে এবং দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে উৎসাহিত করবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ