যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের শ্যামনগর গ্রামে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার জমি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে রাতারাতি ঘর নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই জমির ওপর আদালতের ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এক প্রবাসী এই দখলদারি চালিয়েছেন। এই ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধার পরিবার। তারা অভিযোগ করেছেন, জমিতে গেলে তাদের খুন-জখমের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই পুরো ঘটনায় পুলিশের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী ওই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম সামছুল হক। তার দেওয়া অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, যশোর সদর উপজেলার সাজিয়ালী মৌজার ২৪৭ নম্বর দাগে মোট ৩৪ শতক জমি রয়েছে। এর মধ্যে ২৯ শতক জমির বৈধ মালিক হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সামছুল হক এবং বাকি ৫ শতক জমির মালিক ছিলেন একই গ্রামের বাসিন্দা শহর আলী। সামছুল হক দীর্ঘদিন ধরে তার ২৯ শতক জমিতে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা লাগিয়ে এবং পারিবারিক কবরস্থান তৈরি করে সেটি ভোগদখল করে আসছিলেন। সমস্যা শুরু হয় যখন শহর আলী তার ভাগের প্রায় ৪.৮০ শতক জমি একই গ্রামের সোবহানের ছেলে প্রবাসী মানিকের কাছে বিক্রি করে দেন।
জমি কেনার পর থেকেই প্রবাসী মানিকের চোখ পড়ে সামছুল হকের জমির ওপর। মানিক তার কেনা ৫ শতক জমির সীমানা অতিক্রম করে বীর মুক্তিযোদ্ধার জমির একটি বড় অংশ জোর করে দখলের চেষ্টা শুরু করেন। বারবার বাধা দেওয়ার পরও মানিক পিছু না হটলে বাধ্য হয়ে সামছুল হক আদালতের শরণাপন্ন হন। তিনি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে ওই বিতর্কিত জমির ওপর ১৪৪ ধারা জারি করেন। আইনের ভাষায় ১৪৪ ধারা জারি থাকলে কোনো পক্ষই ওই জমিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন, নির্মাণকাজ বা দখলদারি চালাতে পারে না।
কিন্তু আইনের এই কড়া নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রবাসী মানিক সম্প্রতি দেশে ফেরেন। অভিযোগ রয়েছে, দেশে ফিরেই তিনি স্থানীয় কিছু চিহ্নিত ও প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদের ভাড়ায় নিয়ে আসেন। গত ১৯ জুন রাতের অন্ধকারে তিনি ওই সন্ত্রাসীদের সাথে নিয়ে জোরপূর্বক মুক্তিযোদ্ধার জমিতে বালু ফেলে ভরাট করে ফেলেন। শুধু ভরাট করেই তিনি থেমে থাকেননি, রাতারাতি সেখানে একটি টিনশেড ঘরও নির্মাণ করে ফেলেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা যিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, আজ স্বাধীন দেশে তার নিজের জমিটুকু রক্ষা করতে না পেরে তিনি চরম হতাশ ও অসহায় হয়ে পড়েছেন।
বর্তমান সময়ে জমি দখল আমাদের সমাজে একটি বড় ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের গ্রামাঞ্চলে জমিজমা সংক্রান্ত মামলাগুলোর প্রায় ৪০% থেকে ৫০% মামলাই হয় এমন জোরপূর্বক দখলের কারণে। অনেক সময় প্রবাসীরা দেশে ফিরে স্থানীয় প্রভাবশালী বা কিশোর গ্যাংয়ের সাহায্যে এমন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েন। একটি সাধারণ টিনশেড ঘর বানাতে হয়তো ৫০০থেকে১০০০ডলার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো খরচ হয়, কিন্তু এই সামান্য খরচে তারা লাখ লাখ টাকার জমি দখল করে নেন। এমন অপরাধের কারণে সমাজে শুধু বিশৃঙ্খলাই বাড়ে না, বরং আইনের শাসনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও ১০০% কমে যায়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত প্রবাসী মানিক সব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, “আমি যখন জমি কিনেছি, তখন দলিলে আমার সীমানা খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছিল। আমি আমার দলিল অনুযায়ীই জমিতে বালু ফেলে তা ভরাট করেছি এবং সেখানে একটি ঘর নির্মাণ করেছি। আমি মুক্তিযোদ্ধার জমি দখল করিনি। আর এক্ষেত্রে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও হয়নি এবং আমি কাউকে ভাড়াও করিনি।” মানিকের এই দাবি এবং মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগের মধ্যে কোনটি সত্য, তা এখন আদালতের তদন্তের বিষয়।
তবে এই ঘটনায় সাজিয়ালী পুলিশ ফাঁড়ির ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ১৪৪ ধারা জারি থাকার পরও কীভাবে রাতের আঁধারে একটি ঘর নির্মাণ করা হলো, তা নিয়ে সবাই বিস্মিত। এ বিষয়ে সাজিয়ালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আব্দুর রউফ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আদালতের নির্দেশে আমরা উভয় পক্ষকেই জমিতে শান্তি বজায় রাখতে বলেছিলাম। তবে রাতের আঁধারে মানিক ওই জমিতে ঘর নির্মাণ করেছেন বলে আমরা জেনেছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনের নিরাপত্তা এবং তার শেষ বয়সের মাথা গোঁজার ঠাঁই রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা দাবি করছেন, প্রশাসন যেন দ্রুত এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে এবং আদালতের নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যদি আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়, তবে সমাজে এমন অপরাধীদের দৌরাত্ম্য আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।













