দীর্ঘ এক যুগ ধরে নিখোঁজ থাকা বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমেরহস্য নিয়ে এবার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। ২০১২ সালে ইলিয়াস আলীকে ঠিক কীভাবে এবং কাদের নির্দেশে গুম করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে সরাসরি সাক্ষ্য দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্য। ওই সেনাসদস্যের নাম ইমরুল কায়েস। আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ উপস্থিত হয়ে তিনি এই জবানবন্দি দেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিনি পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানী ঢাকার বনানী এলাকা থেকে গাড়িচালকসহ হঠাৎ করেই গুম হয়ে যান বিএনপির সেই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নেতা ইলিয়াস আলী। এরপর দীর্ঘ ১২ বছরেও তাঁর কোনো খোঁজ পায়নি তাঁর পরিবার। পরিবারের সদস্যরা এখনো তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া নিজের জবানবন্দিতে সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস অত্যন্ত সাবলীলভাবে ঘটনার পেছনের অনেক অজানা তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০০১ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে আর্মাড কোরে যোগদান করেন। এরপর ২০১০ থেকে শুরু করে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেষণে বা বিশেষ বদলিতে র্যাব হেডকোয়ার্টারে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তিনি র্যাব ইন্টেলিজেন্সের পরিচালকের ‘রানার’ বা ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান। রানার হিসেবে তিনি সবসময় তখনকার র্যাবের প্রভাবশালী কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের সঙ্গেই থাকতেন।
ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার রাতের কথা বলতে গিয়ে সেনাপোশাকে থাকা ইমরুল কায়েস বলেন, “২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে একটি বিশেষ মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার, মেজর নওশাদ স্যার এবং স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা সবাই মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছাকাছি যাই। কাকে ওই গাড়ি থেকে পিক করা হবে বা তুলে নেওয়া হবে, তা আমি আগে থেকে জানতাম না। জিয়া স্যার তখন গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। টার্গেট ঠিক কখন ওই জায়গায় আসবে, তা জানার জন্যই তিনি বারবার ফোন করছিলেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে জানা যায় যে টার্গেট আজ আর আসবে না। মিশন বাতিল হওয়ার পর আমরা সেখান থেকে ফিরে গিয়ে জিয়া স্যারকে তাঁর বাসায় নামিয়ে দিই। এরপর স্যারকে বলে পরের দিন সকালে আমি ৯ দিনের একটি ছুটিতে চলে যাই।”
ইমরুল কায়েস তাঁর জবানবন্দিতে আরও বলেন, “আমি যখন ছুটিতে বাড়িতে ছিলাম, তখন টিভি ও মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি যে ইলিয়াস আলী নামের একজন বড় বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভারব্রিজের ওখান থেকেই অপহরণ করা হয়েছে। ৯ দিনের ছুটি শেষ করে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে আমি আবার আমার কর্মস্থলে যোগদান করি। কিন্তু যোগদানের পরপরই আমি র্যাব হেডকোয়ার্টারে এক অদ্ভুত ও থমথমে পরিবেশ লক্ষ করি। পরে আমার অন্যান্য সহকর্মীদের মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে, কোতের বা অস্ত্রাগারের অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার খাতা এবং সেই রাতের সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নিজেই নষ্ট করে ফেলেছেন।”
জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে এসে ইমরুল কায়েস সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্যটি দেন। তিনি বলেন, জিয়াউল আহসান একদিন তাঁর সামনেই ফোনে কারও সাথে বেশ উত্তেজিত হয়ে কথা বলছিলেন। ওই সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কল এলে তিনি আগের জনকে বলেন, “তুই রাখ, তারেক স্যার ফোন দিয়েছেন।” এই ‘তারেক স্যার’ হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক। জিয়া স্যার তখন তারেক স্যারের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। অপর প্রান্তে থাকা তারেক স্যার ঠিক কী বলেছিলেন তা ইমরুল কায়েস শুনতে পাননি। তবে তিনি স্পষ্ট শুনেছেন যে, জিয়া স্যার অত্যন্ত অভিযোগের সুরে বলছিলেন, “স্যার, আপনাদের কথামতোই তো ইলিয়াসকে গলফ করলাম (গুম করলাম), এখন আপনারা এমন করলে হবে! এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে বরং জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠায়ে দেন, এটাই আমার জন্য ভালো।”
এই চাঞ্চল্যকর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার একমাত্র আসামি হলেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি নিজে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। এই সাক্ষ্যের পর ইলিয়াস আলী গুমের তদন্ত আরও নতুন গতি পাবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। দেশের সাধারণ মানুষ এবং ইলিয়াস আলীর পরিবার এখন এই গুমের পেছনের সব সত্য বেরিয়ে আসার এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।













