স্বাধীন বিচার বিভাগ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ। কিন্তু বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করে সেটিকে পুনরায় সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির এই দিনটিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য একটি ‘কালো দিন’ বা ‘ব্ল্যাক ডে’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ পুরোপুরি রুদ্ধ করে দেওয়া হলো এবং সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় কুঠারাঘাত করা হলো।
সংবাদ সম্মেলনে শিশির মনির বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পেছনের দীর্ঘ ও বঞ্চনার ইতিহাস সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের স্বাধীনতার পর থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাকশাল এবং দীর্ঘ সামরিক শাসনের কারণে বিচার বিভাগ কখনো শতভাগ (১০০%) স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার দীর্ঘ লড়াইয়ের পর গত ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দেন। ওই রায়ে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়, মাত্র ৯০ দিনের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই রায়ের ওপর ভিত্তি করে গত ৩০ নভেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার একটি বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করে পৃথক সচিবালয় তৈরি করে। পরে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ নিজে এই স্বাধীন সচিবালয়ের উদ্বোধন করেছিলেন।
কিন্তু দেশের বিচার ব্যবস্থার এই ইতিবাচক পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে যায় গত ৯ এপ্রিল। বর্তমান সরকার কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ওই অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয়। এরপর এর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করা হয় এবং আদালত অবমাননার কড়া নোটিশও পাঠানো হয়। এসব আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে সরকার বিচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিবসহ মোট ১৫ জন কর্মকর্তাকে পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করে। শিশির মনিরের মতে, এই ১৫ জনকে বদলি করার মাধ্যমে মূলত স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের কফিনে সরকার শেষ পেরেকটি নির্দয়ভাবে ঠুকে দিল। এর ফলে বিচারকদের ওপর শাসনবিভাগের খবরদারি করার পুরোনো প্রথা আবার ফিরে এল।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে থাকবে, সেটি নিয়ে শিশির মনির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, বিচারকদের বদলি, ছুটি এবং পদোন্নতির সম্পূর্ণ দায়িত্ব কোনোভাবেই সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকা উচিত নয়। এটি সরাসরি স্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকতে হবে। সরকার যদি এমন কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত নেয় যা সংবিধান বা আইনসম্মত নয়, তবে স্বাধীন বিচারকেরা নির্ভয়ে সেটির বিচার করবেন। কিন্তু সরকার যদি ভয় দেখায় যে রায় নিজেদের পক্ষে না গেলে বিচারকদের পদোন্নতি আটকে দেবে অথবা শাস্তিমূলক বদলি করে সুন্দরবন বা বান্দরবানের মতো দুর্গম এলাকায় পাঠিয়ে দেবে, তবে বিচারকেরা কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। মূলত রাত তিনটার সময় বা সন্ধ্যায় নিজেদের খেয়ালখুশিমতো আদালত বসিয়ে বিরোধীদের মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়ার অভিপ্রায় থাকলেই কেবল আইন মন্ত্রণালয় এই নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে জিম্মি রাখতে চায়।
জুলাই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ঐতিহাসিক অঙ্গীকারের কথাও তিনি সবাইকে মনে করিয়ে দেন। এই সনদের ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে মাত্র একটি রাজনৈতিক দল ছাড়া বিএনপিসহ দেশের প্রায় ৯৯% রাজনৈতিক দল স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত হয়েছিল। অথচ এখন সেই লিখিত প্রতিশ্রুতির চরম বরখেলাপ করা হচ্ছে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ একটু ন্যায়বিচারের আশায় প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) বা হাজার হাজার কোটি টাকা উকিল ও আনুষঙ্গিক খরচের পেছনে ব্যয় করেন। বিচার বিভাগ স্বাধীন না হলে সাধারণ মানুষের এই বিপুল অর্থ এবং জীবনের মূল্যবান সময় পুরোটাই বৃথা যাবে। বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে প্রায় ৪০ লাখের বেশি মামলা ঝুলে আছে। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে এই জট কখনোই কমবে না।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের কড়া জবাব দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে জুলাই সনদের ওপর একটার পর একটা আঘাত হানছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে নতুন করে একটি কর্তৃত্ববাদ বা স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তিনি বর্তমান সরকারকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দেন। তিনি বলেন, বিগত সরকার দেশে যে স্বৈরতান্ত্রিক ও নিপীড়নের পথ দেখিয়ে গেছে, বর্তমান সরকারও ঠিক সেই একই ধ্বংসাত্মক পথ অনুসরণ করছে। দেশের ছাত্র-জনতা বিগত সরকারকে যেভাবে ক্ষমতা থেকে টেনে নামিয়ে বিদায়ের পথ দেখিয়েছে, বর্তমান সরকার বিচার বিভাগে এই হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখলে জনগণ তাদেরও ঠিক একই পথে বিদায় নিতে বাধ্য করবে। বিচার বিভাগকে সরকারের পকেটে রাখার এই প্রবণতা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ একেবারেই সংকুচিত হয়ে যাবে।
গুরুত্বপূর্ণ এই সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আরও অনেক জ্যেষ্ঠ ও শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান উল্লেখযোগ্য। তারা সবাই বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।
















