বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশ ঘিরে বড় ধরনের নাশকতার ছক কষেছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বাহিনীর সাধারণ সদস্যদের উসকে দিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দরবার কর্মসূচিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগে তিন আনসার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার বিকেলে এই তিনজন আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির মতো একটি সুশৃঙ্খল জায়গায় এমন বিদ্রোহের চেষ্টায় সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের ভেতর বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত একটি বাহিনীর ভেতরে এ ধরনের অপচেষ্টা সত্যিই গভীর চিন্তার বিষয়।
গ্রেপ্তার হওয়া এই তিন তরুণ হলেন গাজীপুর মহানগরীর সামান্তাপুর গ্রামের আফাজ উদ্দিন সরকারের ছেলে রায়হান উদ্দিন সরকার, একই সামন্তপুর এলাকার ইউনুস আলীর ছেলে আশরাফুল আলম এবং নগরের নহরীর পাড় এলাকার ইউনুস আলীর ছেলে শাকিল আহমেদ। তারা তিনজনেই আনসার বাহিনীর ‘ইয়ুথ লিডারশিপ কোর্স’ বা যুব নেতৃত্ব কোর্সের অত্যন্ত মেধাবী প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। এর পাশাপাশি তারা নিজ নিজ এলাকায় টিডিপি দলনেতা হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। স্থানীয়ভাবে বেশ পরিচিত ও দায়িত্বশীল পদে থাকা এই তরুণেরা কেন এমন একটি রাষ্ট্রবিরোধী পদক্ষেপে জড়ালেন, তা নিয়ে অনেকেই চরম বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২০ মে বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশ ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দরবার কর্মসূচি বানচাল করার জন্য এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গোপনে কাজ করছিল। তারা আনসারের ইনস্ট্রাক্টর কোর্সের সাধারণ প্রশিক্ষণার্থীদের নানাভাবে ভুল বুঝিয়ে সংঘবদ্ধ করে একটি বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। চক্রটি বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের নেতিবাচক ও মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছিল, যাতে সাধারণ সদস্যদের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়। নিজেদের মধ্যে গোপনীয় যোগাযোগের জন্য তারা হোয়াটসঅ্যাপে একটি বিশেষ গ্রুপ খুলেছিল। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ডিজিটাল নজরদারি ফাঁকি দিতে তারা বেশ কিছু বিদেশি ও অজ্ঞাত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার জোরালো অপচেষ্টা চালায়।
তাদের মূল লক্ষ্য ছিল গত ১৭ মে গাজীপুরের সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠান। ওই অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রায় ১৭৭ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা অত্যন্ত সুকৌশলে এই ১৭৭ জনের ভেতরে ঢুকে তাদের উসকে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। তারা সাধারণ সদস্যদের সামনে বেশ কিছু লোভনীয় ও যৌক্তিক দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মাসিক ভাতা অন্তত ৪০% থেকে ৫০% বৃদ্ধি করা, শতভাগ (১০০%) সদস্যের জন্য পূর্ণাঙ্গ রেশন সুবিধা চালু করা, চাকরি দ্রুত স্থায়ী করা এবং নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া।
বর্তমানে দেশে যে হারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, তাতে একজন সাধারণ আনসার সদস্য মাসে যে সামান্য ভাতা পান, তা দিয়ে জীবনযাপন করা রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাদের বর্তমান মাসিক আয় আন্তর্জাতিক মুদ্রায় হিসাব করলে প্রায় ১২০
থেকে ১৫০ (ডলার) এর কাছাকাছি দাঁড়ায়। এই চরম আর্থিক দুর্বলতা ও ক্ষোভকেই নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে পুঁজি করেছিল চক্রটি। তাদের পরিকল্পনা ছিল, দাবিগুলো আদায়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিকে ব্ল্যাকমেইল হিসেবে ব্যবহার করা। তারা ভেবেছিল, প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে হঠাৎ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে বা গণমাধ্যমকে দেখিয়ে চাপ প্রয়োগ করলে সরকার বাধ্য হয়ে সাথে সাথে তাদের দাবিগুলো মেনে নেবে।
কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থা ও আনসার বাহিনীর নিজস্ব কঠোর নজরদারিতে তাদের এই গোপন ছক আগেই ফাঁস হয়ে যায়। সমাবেশকে নিষ্কণ্টক রাখতে কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। গত বৃহস্পতিবার আনসার ও ভিডিপির অ্যাডজুট্যান্ট মাসুদ হাসান বাদী হয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় একটি বিস্তারিত মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ওই তিনজনকে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। বাহিনীর ভেতরে থাকা বাকি সদস্যদের কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়, যাতে কেউ এই ফাঁদে পা না দেয়।
মামলার বাদী অ্যাডজুট্যান্ট মাসুদ হাসান গণমাধ্যমকে জানান, একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে কোনোভাবেই এমন বিশৃঙ্খলা, চেইন অব কমান্ড ভাঙার চেষ্টা বা বিদ্রোহ মেনে নেওয়া যায় না। জাতীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে যারা এই হীন চক্রান্ত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কালিয়াকৈর থানায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মামলা করা হয়েছে। পুলিশ খুব দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তিনজনকে ধরেছে এবং বাহিনীর ভেতরে তাদের আর কোনো সহযোগী লুকিয়ে আছে কি না, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
কালিয়াকৈর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম পুরো আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তাদের নিজেদের হেফাজতে রেখে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করে নেন। এরপর গতকাল শুক্রবার বিকেলে তাদের গাজীপুরের সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে তারা বিচারকের সামনে নিজেদের অপরাধ বুঝতে পেরে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। বিচারক তাদের বক্তব্য রেকর্ড করার পর সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সরকার ও প্রশাসন এই ঘটনার মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, দাবি আদায়ের জন্য দেশের কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
















