রাশিয়ার বিশাল পারমাণবিক মহড়ায় প্রথমবারের মতো সরাসরি অংশ নিলেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো। চলতি সপ্তাহে মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই ভয়ংকর সামরিক মহড়া চলে। মহড়াটি পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে একেবারে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। লুকাশেঙ্কো এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একসঙ্গে এই মহড়া তদারকি করেন। এই মহড়ায় তারা শুধু সাধারণ অস্ত্র নয়, বরং ‘ট্যাকটিক্যাল’ এবং ‘স্ট্র্যাটেজিক’ দুই ধরনের পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক ব্যবহার করেন। রাশিয়ার সামরিক বাহিনী তাদের কয়েক শ মিসাইল লঞ্চার, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং পারমাণবিক সাবমেরিন এই মহড়ায় নামায়।
বেলারুশের ৭১ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো ১৯৯৪ সাল থেকে একটানা ক্ষমতায় বসে আছেন। পশ্চিমা বিশ্ব তাকে প্রায়ই ‘ইউরোপের শেষ স্বৈরশাসক’ বলে ডাকে। মহড়া চলাকালে তিনি খুব কড়া ভাষায় একটি বার্তা দেন। তিনি বলেন, বেলারুশ কাউকে হুমকি দিচ্ছে না, কিন্তু তাদের হাতে এখন ভয়ংকর পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। দেশের ব্রেস্ট শহর থেকে শুরু করে রাশিয়ার ভ্লাদিভস্তক বন্দর পর্যন্ত বিশাল মাতৃভূমি রক্ষায় তারা যেকোনো উপায় বেছে নিতে ১০০% প্রস্তুত। তবে মজার ব্যাপার হলো, লুকাশেঙ্কো সব সময় পুতিনের কথায় ওঠেন বসেন না। নব্বইয়ের দশক থেকেই রাশিয়া বেলারুশকে নিজেদের সঙ্গে পুরোপুরি মিলিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে, কিন্তু লুকাশেঙ্কো খুব চালাকির সঙ্গে সেই চেষ্টা আটকে দিয়েছেন।
লুকাশেঙ্কো তার রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে বেশ চতুরতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। রাশিয়া তাকে টিকিয়ে রাখতে অনেক বছর ধরে রাজনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে। এর বিনিময়ে বেলারুশ রাশিয়ার কাছ থেকে অনেক সস্তায় তেল ও গ্যাস কেনে। হিসাব করলে দেখা যায়, বাজারদরের চেয়ে প্রায় ৩০% থেকে ৪০% কম দামে জ্বালানি পেয়ে বেলারুশ প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার ($) সাশ্রয় করে। এত সুবিধা নেওয়ার পরও লুকাশেঙ্কো সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক কিছুটা ভালো করার চেষ্টা করেছেন। তাই হঠাৎ করে রাশিয়ার পারমাণবিক মহড়ায় তার এমন অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক মহলে অনেক বড় রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
পুতিন গত বৃহস্পতিবার জানান, স্ট্র্যাটেজিক ও ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর প্রস্তুতি এখন আরও বাড়ানো দরকার। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তারা এই মহড়ায় কাজে লাগাচ্ছেন। মহড়ার সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ ছিল ‘ইয়ার্স’ নামের একটি আন্তমহাদেশীয় ও হাইপারসনিক মিসাইলের উৎক্ষেপণ। পুতিন ও লুকাশেঙ্কো একসঙ্গে এই মিসাইল ছোড়ার নির্দেশ দেন। মিসাইলটি সেকেন্ডের ভগ্নাংশে উড়ে যায় এবং মাত্র ২০ মিনিটেরও কম সময়ে প্রায় ৫ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। রাশিয়ার প্লেসেতস্ক কসমোড্রোম থেকে উড়ে এটি প্রশান্ত মহাসাগরের কামচাতাকা উপদ্বীপে গিয়ে নিখুঁতভাবে আঘাত হানে। ইয়ার্স মিসাইল একসঙ্গে তিনটি ভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে।
জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন এই মহড়া নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বাইরে থেকে কোনো বড় কারণ না দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এদিকে রাশিয়া বেলারুশকে খুশি করতে বিশেষ সংস্করণের বেশ কিছু সু-২৫ যুদ্ধবিমান উপহার দিয়েছে। একই সঙ্গে ৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে, এমন ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক মিসাইলও মিনস্কের হাতে তুলে দিয়েছে মস্কো। ২০২২ সালের শুরুর দিকে এক গণভোটের মাধ্যমে বেলারুশ তাদের সংবিধানে পরিবর্তন আনে। এরপরই রাশিয়া তাদের পারমাণবিক বোমাগুলো ইউক্রেন সীমান্ত থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে বেলারুশের আসিপোভিচি ঘাঁটিতে মজুত করে রাখে।
ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক বোমা দিয়ে মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জায়গায় হামলা চালানো হয়। এতে তেজস্ক্রিয়তা কম ছড়ায় এবং প্রাণহানি কিছুটা কম হয়। কিন্তু স্ট্র্যাটেজিক পারমাণবিক বোমা বা হাইড্রোজেন বোমা দিয়ে চোখের পলকে পুরো একটি শহর ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব। ইউক্রেন এখন ভয় পাচ্ছে যে রাশিয়া হয়তো বেলারুশের মাটি ব্যবহার করে নতুন কোনো ফ্রন্ট খুলবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনে খুব বেশি সুবিধা করতে না পেরে রাশিয়া এখন উত্তর ইউক্রেন ও রাজধানী কিয়েভের ওপর নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করছে। এই মহড়া মূলত তারই প্রস্তুতি।
তবে কিয়েভের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেনকো মনে করেন, নতুন করে হামলা চালানোর জন্য বেলারুশে এখন যথেষ্ট পরিমাণ রুশ সেনা নেই। আর লুকাশেঙ্কো যদি শুধু নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে ইউক্রেনে হামলা চালান, তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। বেলারুশের জন্য এই যুদ্ধে সরাসরি জড়ানো মানে বিশাল ঝুঁকি নেওয়া। আমরা জানি, ২০২২ সালে লুকাশেঙ্কো রুশ বাহিনীকে বেলারুশ ও ইউক্রেনের ১ হাজার ৮৪ কিলোমিটার লম্বা সীমান্ত ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন। সেবার রুশ বাহিনী মাত্র ৩ দিনের মধ্যে কিয়েভ দখলের স্বপ্ন নিয়ে হামলা চালালেও শেষ পর্যন্ত তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। এমনকি চেরনোবিলের মতো ভয়ংকর তেজস্ক্রিয় এলাকায় গিয়ে অনেক রুশ সেনা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। স্থলপথে পিছু হটলেও বেলারুশের মাটি থেকে রুশ বাহিনী এখনো ইউক্রেনে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
















